অবরোধের মধ্যেও মালয়েশিয়া উপকূলে ইরানের তেল বাণিজ্য অব্যাহত

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মালয়েশিয়ার উপকূলবর্তী সমুদ্রাঞ্চলকে কেন্দ্র করে ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে ইরানের তেল গোপনে চীনে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় আউটার পোর্ট লিমিটস (ইওপিএল) দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গত শনিবার ‘হিউম্যানিটি’ নামের একটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালী অতিক্রম করে মালয়েশিয়ার উপকূলের দিকে অগ্রসর হয়। পরে এটি দক্ষিণ চীন সাগরে মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস এলাকায় পৌঁছে হঠাৎ স্বয়ংক্রিয় পরিচিতি ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়।

স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জাহাজটি তখন আরেকটি অপেক্ষমাণ জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এরপর সেই তেল একাধিক মধ্যবর্তী জাহাজের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত চীনে পৌঁছানোর কথা।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই চীন কিনে থাকে।

বহু বছরের গোপন তেল বাণিজ্যের কেন্দ্র
বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দশক ধরে মালয়েশিয়ার ইওপিএল এলাকা ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল কেনাবেচার একটি অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এবং ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ চলাকালেও এ এলাকায় তেল স্থানান্তর বন্ধ হয়নি। এমনকি ১৪ জুলাই অবরোধ পুনরায় শুরু হওয়ার পরও একই ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রকল্প সিলাইটের পরিচালক রে পাওয়েল বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল, মালয়েশিয়ার ইওপিএল, হংকং এবং উত্তর চীনের মধ্যে চলাচলকারী অন্তত ৬২টি জাহাজ ভুয়া অথবা বাতিল করা পরিচয় ব্যবহার করে অবস্থান গোপন করেছে।

কীভাবে গোপন করা হয় তেলের উৎস
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউনস বলেন, চীনের উদ্দেশে ইরানের তেল পাঠানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জলসীমায় একাধিকবার জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয়, যাতে তেলের প্রকৃত উৎস গোপন রাখা যায়।

তার ভাষ্য, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি যেমন সিএনপিসি, সিনোপেক কিংবা সিএনওওসি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হওয়ায় তারা ঝুঁকি নেয় না। কিন্তু চীনের ছোট স্বাধীন ‘টিপট’ রিফাইনারিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল হওয়ায় তারা ছাড়মূল্যে নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন ইরানি তেল কিনতে আগ্রহী।

যুদ্ধের মধ্যেও ছিল ব্যস্ত নোঙর এলাকা
এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজবিষয়ক ইয়োকোসুকা কাউন্সিলের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কর্মসূচির পরিচালক চার্লি ব্রাউন বলেন, মালয়েশিয়ার ইওপিএল এলাকা যুদ্ধের আগে যেমন ব্যস্ত ছিল, যুদ্ধ চলাকালেও ঠিক তেমনই ছিল।

তার ভাষায়, “সংঘাতের প্রতিটি পর্যায়ে সেখানে জাহাজ নোঙর করেছে এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।”

হংকংয়ের প্রায় সমান আয়তনের এই নোঙর এলাকা তুলনামূলক শান্ত সমুদ্র হওয়ায় বড় ট্যাংকারগুলোর জন্য এটি আদর্শ স্থান। একই সঙ্গে এটি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থার কাছাকাছি হলেও মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এখানকার আইনি অবস্থান কিছুটা ধূসর ছিল।

আইন কঠোর করেছে মালয়েশিয়া
ইওপিএল মালয়েশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে থাকলেও এটি দেশটির আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে। ফলে সেখানে মৎস্য আহরণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিধান থাকলেও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের বিষয়টি তুলনামূলক জটিল।

মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি অতীতে জানিয়েছিল, দূরবর্তী অবস্থান এবং এখতিয়ারগত সীমাবদ্ধতার কারণে এলাকাটি কার্যকরভাবে নজরদারি করা কঠিন।

তবে জুন মাসে দেশটি তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন সংশোধন করে সরকারি অনুমতি ছাড়া নোঙর করা, জ্বালানি সরবরাহ (বাংকারিং) এবং জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান যুক্ত করেছে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

শত শত জাহাজের ভিড়
চার্লি ব্রাউনের তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০টি জাহাজ ওই এলাকায় নোঙর করে থাকে, যার প্রায় অর্ধেকেরই ইরানের সঙ্গে কোনও না কোনও সম্পর্ক রয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার পর্যালোচনা করা সর্বশেষ স্যাটেলাইট তথ্যানুযায়ী, গত এক মাসে হিউম্যানিটিসহ অন্তত ১৮টি ইরানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ ইওপিএলে পৌঁছে পরে তাদের এআইএস সংকেত বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ডোরে নামের আরেকটি ইরানি ট্যাংকারকে সম্প্রতি মালাক্কা প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ফিরে যেতে দেখা গেছে।

এছাড়া বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অন্তত ৫০টি জাহাজ এআইএস চালু রেখেই অবস্থান করছিল। এর মধ্যে তিনটি ইরানি পণ্যবাহী ও কনটেইনার জাহাজও ছিল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ ছাড়া আরও অনেক ‘ডার্ক শিপ’ সেখানে অবস্থান করছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর অর্থনৈতিক কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, এসব তেল বিক্রির অর্থ পরিশোধে চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত সুইফট নেটওয়ার্কের বাইরে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্ভব হয়।

চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানি তেল আমদানির কথা স্বীকার করে না। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্রও আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার ইওপিএল হয়ে ইরানি তেল পরিবহনের বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।

তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিহীন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং তথাকথিত ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এর তারা বিরোধিতা করে।

এরিকা ডাউনসের মতে, গত বছর ইরান দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল চীনে রফতানি করলেও চীনের শুল্ক তথ্যানুযায়ী ইরান থেকে কোনও তেল আমদানির রেকর্ড নেই। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে চীনের তেল আমদানির পরিমাণ দেশটির প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল, যা ইঙ্গিত করে যে ওই তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্য কোনো দেশ- বিশেষ করে ইরান-থেকে এসেছে।

চীনের অবস্থান
গত এপ্রিলের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল কেনার অভিযোগে চীনের পাঁচটি স্বাধীন রিফাইনারির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং জাতিসংঘের কোনও অনুমোদনও এর পেছনে নেই।

এ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র আরও ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকার এবং চীন ও হংকংভিত্তিক পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, যাদের ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি বেইজিং।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর চীনের রিফাইনারিগুলোর ইরানি তেল কেনা প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়ার ইওপিএলের মতো নেটওয়ার্কগুলো এখনও ইরানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল চীনে পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে।

চার্লি ব্রাউনের ভাষায়, “নিষেধাজ্ঞা কখনওই এই বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। নিষেধাজ্ঞার কারণে বাজার ও অর্থপ্রদানের পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু তেল প্রবাহ থামেনি। বাস্তবে ইরান থেকে চীনে তেল যাওয়া বন্ধ করেছিল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ।” সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights