ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ ২০ অসচ্ছল নারী পেলেন বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার
অনলাইন ডেস্ক
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নের বেশ বড় একটি অংশজুড়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। তাদের দিন কাটে বেশ অযত্ন আর অবহেলায়।
মূল কারণ অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। বেশির ভাগের অবস্থা দিন আনে দিন খায় গোছের। কেউ কেউ আবার দু-এক বেলা না খেয়েও দিন কাটায়। জুগিয়াপাড়া গ্রামের কাজলী মার্ডের দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তার হিসাব কষে।
সেলাই মেশিনে আয় করার প্রত্যয়
স্বামী ভ্যান চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে কোনোভাবে সংসারের চাকা ঘোরে। কিন্তু তিন মেয়ের লেখাপড়ার খরচ, খাবার, পোশাক আর নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় এই পরিবারকে। অভাবের চাপ যতই বাড়ুক, মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার কথা কখনো ভাবেননি কাজলী। নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নটিকেই আঁকড়ে ধরেছেন দৃঢ়ভাবে।
সেলাইয়ের কাজ কিছুটা জানতেন। সেলাই করে আয়ের আগ্রহ থাকলেও একটি সেলাই মেশিনের অভাবে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারেননি। অবশেষে বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে সেলাই কাজের আরো বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার হিসেবে সেলাই মেশিন তাঁর জীবনে এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার বার্তা। আবেগাপ্লুত কাজলী মার্ডে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই ইচ্ছা ছিল সেলাইয়ের কাজ করে কিছু আয় করব। সন্তানদের পড়ালেখায় নিজের আয়কে কাজে লাগাব।
কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় মেশিন কিনতে পারিনি। বসুন্ধরা গ্রুপ আমাকে মেশিন দিয়েছে। এখন এই মেশিন দিয়ে কাজ করতে পারব। সংসারে কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারব, মেয়েদের পড়াশোনার খরচও বহন করা সহজ হবে।’ কাজলীর মতো এমনই আরো কয়েকজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী ও দরিদ্র পরিবারের অসচ্ছল নারীকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন দিয়েছে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ।
সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা অডিটরিয়ামে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উপজেলার ২০ জন অসচ্ছল নারীর হাতে সেলাই মেশিন ও দুটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়। কালের কণ্ঠের গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি ও গাইবান্ধা জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অমিতাভ দাস হিমুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা ও শুভসংঘের প্রধান ইমদাদুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান, গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ, পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু, থানা মহিলা দলের সভাপতি মঞ্জুরি আহমেদ, গোবিন্দগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা, পৌর যুবদলের সদস্যসচিব আনোয়ার হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হাদিসুর রহমান, গোবিন্দগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক শিবলী কায়েস মীর প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘের হুমায়ুন কবির বিপ্লব, রাসু, অয়ন সুলতানসহ স্থানীয় সাংবাদিক, সমাজসেবক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।
ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘অসহায় ও অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা সেলাই মেশিন বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছি। একজন নারী যদি নিজের ঘরে বসেই আয় করতে পারেন, তাহলে তাঁর পুরো পরিবার উপকৃত হবে। এই সেলাই মেশিনকে আপনারা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন। আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ আপনাদের পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি আপনাদের হাতে একটি করে গাছও তুলে দেওয়া হয়েছে। সেলাই মেশিনের মাধ্যমে যেমন নিজের ও পরিবারের উন্নয়ন করবেন, তেমনি গাছগুলোরও যত্ন নেবেন।’
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামশিদ ইরাম খান বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের মতো একটি বৃহৎ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য গোবিন্দগঞ্জকে বেছে নিয়েছে। এ জন্য আজ আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই উদ্যোগের সুবিধাভোগীদের মধ্যে সাঁওতাল নারীরাও রয়েছেন, যা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন পাওয়ার মাধ্যমে তাঁদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এটি তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বসুন্ধরা গ্রুপের এমন মানবিক উদ্যোগ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আমি আশা করি, ভবিষ্যতেও তারা সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।’
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের এই উদ্যোগটি অনন্য। সেলাই মেশিন পেয়ে অনেক নারী স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন। আশা করি, ভবিষ্যতেও বসুন্ধরা গ্রুপ শুভসংঘের মাধ্যমে তাদের মানবিক কার্যক্রমগুলো অব্যাহত রেখে দরিদ্র মানুষের পাশে থাকবে।’
পৌর বিএনপির সভাপতি রবিউল কবির মনু বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ সারা দেশে মানুষের কল্যাণে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাতে সাধারণ মানুষ অনেক উপকৃত হচ্ছে। তাদের সফলতা কামনা করছি।’
জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন দিপু বলেন, ‘অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বসুন্ধরাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। যাঁরা সেলাই মেশিন পেয়েছেন, তাঁরা শুধু একটি কর্মসংস্থানের উপকরণই পাননি, পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বার্তা হিসেবে গাছের চারাও পেয়েছেন। গাছ যেমন পরিবেশকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলে, তেমনি একটি সেলাই মেশিন একটি পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ খুলে দিতে পারে।’
আদিবাসি নেত্রী এমিলি হেমব্রম বলেন, ‘অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের পাশে কাউকে পাওয়া যায় না। আমাদের সেই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ প্রমাণ করেছে, মানুষ মানুষের জন্য। আমাদের যে নারীরা সেলাই মেশিন পেয়েছেন, তাঁদের খুবই উপকার হবে। এই পরিবারগুলো এখন নিশ্চিন্তে চলতে পারবে। অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘের প্রতি।’
অনুষ্ঠান শেষে বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে তিন মাস প্রশিক্ষণ পেয়ে দক্ষ হয়ে ওঠা নারীরা বসুন্ধরা গ্রুপের উপহার হিসেবে পাওয়া সেলাই মেশিন ও গাছের চারা নিয়ে পরিবারকে সচ্ছল করার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাড়ির পথ ধরেন।
