সৈকতে শালিকের রাজত্ব, পর্যটক কমায় ফিরছে প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ
উত্তম কুমার হাওলাদার, কলাপাড়া
বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে এখন ভিন্ন এক দৃশ্য। পর্যটকের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় দল বেঁধে বিচরণ করছে শত শত শালিক। খাবারের সন্ধানে কখনো বালুচরে ঠোঁট চালাচ্ছে, আবার কখনো ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখিগুলো। প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি হাতে গোনা দর্শনার্থী ও আলোকচিত্রীদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সকালের কোমল আলো কিংবা বিকেলের শেষ রোদে শালিকের ঝাঁক সৈকতের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দূর থেকে বালুচরে ছড়িয়ে থাকা কালো-বাদামি বিন্দুর মতো মনে হলেও কাছে গেলেই দেখা যায় শত শত শালিক নির্ভয়ে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাধারণ সময়ে পর্যটকদের ভিড়, যানবাহনের শব্দ ও নানা কর্মকাণ্ডের কারণে শালিকসহ অন্যান্য পাখি সৈকতের এতটা কাছে আসে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটক কমে যাওয়ায় পাখিগুলো আবার তাদের স্বাভাবিক বিচরণস্থলে ফিরে এসেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনকর্মী জনি আলমগীর বলেন, বর্তমানে পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় শালিকগুলো নির্ভয়ে দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে নামছে। আগে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যেত না। এখন অনেকে শুধু পাখির ঝাঁক দেখতে ও ছবি তুলতেই সৈকতে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, মানুষের চাপ কমলে কুয়াকাটার প্রকৃত সৌন্দর্য নতুনভাবে ফুটে ওঠে। শালিকের ঝাঁক সেই সৌন্দর্যেরই একটি জীবন্ত উদাহরণ।
সৈকতের এই ব্যতিক্রমী দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এটিকে ‘অন্য এক কুয়াকাটা’ বলে মন্তব্য করছেন, যেখানে মানুষের পরিবর্তে প্রকৃতিই হয়ে উঠেছে প্রধান আকর্ষণ।
উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন ‘উপরা’র যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, উপকূলীয় এলাকায় পাখির স্বাভাবিক বিচরণ পরিবেশের সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। মানুষের চাপ কমলে অনেক প্রাণীই তাদের পুরোনো আবাসস্থলে ফিরে আসে। কুয়াকাটার বর্তমান চিত্র তারই বাস্তব উদাহরণ।
তিনি বলেন, কুয়াকাটা শুধু সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখার স্থান নয়, এটি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, কাঁকড়া, সামুদ্রিক প্রাণী ও উপকূলীয় উদ্ভিদ নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে একটি সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র। তাই পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটার অর্থনীতি অনেকটাই পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পর্যটক কমে যাওয়া ব্যবসার জন্য ইতিবাচক নয়। তবে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় প্রকৃতি যে দ্রুত তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারে, শালিকের এই অবাধ বিচরণ তারই প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য—দুই-ই রক্ষা করা সম্ভব। পর্যটকদের সচেতন আচরণ, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ কমানো এবং পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতেও কুয়াকাটায় এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আরও বেশি দেখা যাবে।
