আনুষ্ঠানিকভাবে পাল্টে গেল বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ ‌‘নাউরু’র নাম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ‘নাউরু’ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের রাষ্ট্রীয় নাম পরিবর্তন করে ‘রিপাবলিক অব নাউয়েরু’ নির্ধারণ করেছে। দেশটির নিজস্ব জাতীয় ভাষার সঠিক বানান ও উচ্চারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডেভিড আদিয়াং।

এই নাম পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এতদিন ‘নাউরুয়ান’ নামে পরিচিত এই দেশের অধিবাসীরা এখন থেকে ‘দেই-নাউয়েরু’ নামে অভিহিত হবেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের কান্ট্রি কোডও ‘এনআরইউ’ থেকে বদলে ‘এনআরও’ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে অঞ্চলটি ‘নাউ-রু’ নামে বহুল প্রচারিত হলেও নিজস্ব ভাষায় এর প্রকৃত উচ্চারণ হবে ‘নাউ-য়েরু’।

সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই পদক্ষেপে সুদূর দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি তার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শিকড়ে ফিরে গেল। এর পূর্বে প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, নাউরু শব্দটি তাদের পছন্দের কোনো নাম ছিল না; বরং নামটির স্থানীয় উচ্চারণ বিদেশিদের জন্য কঠিন হওয়ার কারণে সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে এটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। গত জানুয়ারিতে দেশটির পার্লামেন্টে এই সংক্রান্ত বিলটি উত্থাপনের সময় প্রেসিডেন্ট ডেভিড আদিয়াং বলেছিলেন, প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনটি তাদের জাতির ঐতিহ্য, ভাষা ও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যকে আরও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্মান জানানোর একটি সুসংগঠিত প্রয়াস। পার্লামেন্টে দুই দফার ভোটাভুটিতে আইনপ্রণেতারা সংবিধান সংশোধনের এই প্রস্তাবটিকে সমর্থন জানান।

মাত্র ১২ হাজার জনসংখ্যার প্রবাল চুনাপাথরের তৈরি এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভ্যাটিকান সিটি ও টুভালুর পরেই পৃথিবীর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রথমে জার্মানি কর্তৃক উপনিবেশে পরিণত হওয়া এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার অধীনে পরিচালিত এই দেশটি ১৯৬৮ সালে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র লাভ করে। ১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনি উত্তোলনের মাধ্যমে দেশটি বিপুল ধনসম্পদের মুখ দেখলেও ১৯৯০-এর দশকে এই শিল্পের ধস পুরো নাউয়েরুকে অর্থনৈতিক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছিল। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশটি নাগরিকদের পুনর্বাসন ও অবকাঠামো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার তহবিল জোগাতে অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব প্রদান কর্মসূচি শুরু করেছে।

প্রেসিডেন্ট আদিয়াং জানান, নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগটি নবায়িত জাতীয় গর্বের সূচনা নির্দেশ করছে। চলতি বছরের মে মাসে পার্লামেন্টে চূড়ান্ত ভোটাভুটির সময় বিষয়টিতে সাধারণ জনগণের সমর্থন যাচাই করতে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হলেও, টানা ব্যাপক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এই বিষয়ে কোনো গণভোটের প্রয়োজন নেই। সরকারের সর্বশেষ বিবৃতিতে যুক্তি দেওয়া হয়, গণভোটের মূল কাজ জনগণের আকাঙ্ক্ষা নির্ধারণ করা হলেও ‘নাউয়েরু’ শব্দটি কখনোই তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি, বরং পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। এই নামটি ইতিমধ্যে জনগণের নিজস্ব পরিচয় বহন করছে, জাতীয় প্রতীক বা কোট অব আর্মসে রয়েছে এবং সংবিধানগতভাবে এটি সম্পূর্ণ স্বীকৃত।

উপনিবেশকালের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে এর আগে আফ্রিকা মহাদেশের ক্ষুদ্র রাজ্য সোয়াজিল্যান্ড ২০১৮ সালে তাদের ঐতিহ্যবাহী নাম ‘এসোয়াতিনি’-তে ফিরে যায়। আবার ব্র্যান্ডিং রি-ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে ২০২২ সালে তুরস্ক জাতিসংঘে তাদের নাম বদলে ‘তুর্কিয়ে’ করার অনুরোধ জানায়। এবার নাউয়েরু সেই তালিকায় যুক্ত হয়ে তাদের সমস্ত উড়োজাহাজ, নৌযান এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে নতুন নাম স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ তাদের ওয়েবসাইটে গত জুন মাস থেকেই দেশটির নাম পরিবর্তন করে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দূতাবাসগুলো তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেশটিকে ‘নাউয়েরু’ হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights