মাকে বিয়েতে আমন্ত্রণ না জানানোয় কর্মীকে চাকরিচ্যুত করেন মালিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মায়ের সাধারণ চেহারা ও পোশাকের কারণে নিজের বিয়েতে তাকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে একাকী পাশে বসিয়ে রাখার অপরাধে নিজের এক কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করেছেন চীনের এক নামী শিল্পপতি। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর (এসসিএমপি) এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মধ্যাঞ্চলের হেনান কুয়াংশান ক্রেন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান চুই পেইজুন প্রতিষ্ঠানের একটি ইন্টার্নশিপ অনুষ্ঠানে নৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনেন।

কর্মীদের কোটি কোটি টাকা বোনাস দিয়ে ‘চীনের সবচেয়ে দয়ালু বস’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই সিইওর কঠোর অথচ মানবিক সিদ্ধান্ত ঘিরে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানা যায়, চুই পেইজুন তার প্রতিষ্ঠানের ওই কর্মচারীর বিয়ের আমন্ত্রণে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান যে, বরের বিধবা মা বিয়ের মূল প্যান্ডেল বা উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। বরং তাকে কারখানার পেছনের একটি নির্জন স্থানে একা বসিয়ে রাখা হয়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে ওই কর্মী স্বীকার করেন যে, মায়ের চেহারার জন্য তিনি লজ্জিত ছিলেন এবং অতিথিদের সামনে তা তাকে বিব্রত করতে পারে—এই আশঙ্কায় মাকে অতিথিদের তালিকায় রাখেননি।

কর্মচারীর এমন চরম অকৃতজ্ঞতামূল জবাব শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন সিইও চুই পেইজুন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সেই কর্মীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার বাবা মারা যান এবং এই মা-ই অতি কষ্টে তাকে একা মানুষ করেছেন। চুই পেইজুন ক্ষোভ প্রকাশ করে সেই কর্মীকে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, ‘তোমার বয়স যখন দুই বছর তখন তোমার বাবা মারা যান, আর নিজের মায়ের সঙ্গে তুমি এই ধরনের আচরণ করলে?’

এই ঘটনার পরপরই কোনো দ্বিধা না রেখে সেই কর্মচারীকে বরখাস্তের নির্দেশ দেন চুই পেইজুন। পরবর্তীতে ওই কর্মী ভুল স্বীকার করে নিজের চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য বারবার অনুনয়-বিনয় করলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন সিইও। সিইও চুই সরাসরি তাকে জানিয়ে দেন, ‘তোমার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই। আমি দুঃখিত, কিন্তু তোমাকে এখান থেকে চলে যেতেই হবে।’

কর্মচারীকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি সেই অসহায় বিধবা মায়ের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক অসাধারণ পদক্ষেপ নেন চুই পেইজুন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই নারীকে নিজের প্রতিষ্ঠানের লজিস্টিক বিভাগে চাকরি দেন, যেন আগের মতোই নিজের উপার্জনে তিনি মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই সাড়া ফেলে দেয় এবং কয়েক কোটি বার এটি দেখা হয়। তবে কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিচারে বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেটদুনিয়ায় তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদল নেটিজেন সিইওর নীতিবোধ ও মানবিক নেতৃত্বের প্রশংসা করলেও অন্য দল প্রশ্ন তুলেছেন যে, কোনো মালিকের কি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার বা কাউকে চাকরিচ্যুত করার অধিকার আছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের মা-বাবাকে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্যদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের ভান করে মাত্র। প্রতিষ্ঠানটির জন্য তাকে বিদায় দেওয়াই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ অপর একজন মন্তব্য করেন, ‘পেশাগত দক্ষতা হয়তো শিখিয়ে নেওয়া যায়, তবে পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা হলো মানুষের ন্যূনতম মানবিক বোধ।’

অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় আরেক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মূল্যবোধ প্রচার করতেই পারে, কিন্তু পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধা একটি ব্যক্তিগত বিষয়। ওই কর্মী যদি তার পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে থাকেন, তবে তাকে বরখাস্ত করা শ্রম আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।’ একইভাবে সিইওর একচ্ছত্র ক্ষমতার সমালোচনা করে আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘একটি প্রকৃত সভ্য সমাজে প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নৈতিক বিচারক হওয়া উচিত নয়; আইনই সকলের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।’

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights