বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে দিশেহারা চট্টগ্রামের কৃষক-খামারি, মিলছে না পর্যাপ্ত প্রণোদনা

আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম

সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো কৃষক, মৎস্যচাষি ও খামারি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মাছের ঘের, ফসলি জমি ও প্রাণিসম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকেই এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করছেন। তবে সরকারি প্রণোদনা পর্যাপ্ত না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামের মাছচাষি মোহাম্মদ আরিফ জানান, ৮০ শতক আয়তনের মাছের ঘেরে প্রায় ছয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া ধারও রয়েছে। কিন্তু মাসের শুরুতে বন্যার পানিতে ঘেরের সব মাছ ভেসে যাওয়ায় তিনি এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

একই এলাকার মৎস্যচাষি মিরশাদুল ইসলাম রাফির শতাধিক শতকের মাছের ঘেরও পানিতে তলিয়ে যায়। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতির পাশাপাশি আমন ধানের বীজতলাও নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বন্যার সময় জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। এখন ঋণ পরিশোধ ও নতুন করে বিনিয়োগের চিন্তায় দিন কাটছে। সরকারি সহায়তার কথা শুনলেও এখনো কোনো সহযোগিতা পাননি।

বাঁশখালীর আরেক খামারি ফারুক হোসেন জানান, বন্যায় তার দুই হাজার মুরগি মারা গেছে এবং ৫০০ হাঁসের অধিকাংশই ভেসে গেছে। বর্তমানে হাতে রয়েছে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি হাঁস। তাঁর দাবি, বাহারছড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষক, খামারি ও মৎস্যচাষী ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পুঁজি হারিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা। এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও আনোয়ারাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গৃহপালিত পশু-পাখি মারা গেছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ১৬ হাজার ৫৫৬টি পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। প্রায় ৫ হাজার ৬৪৮ হেক্টর জলাশনে ক্ষতির পরিমাণ ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বেশি। একই সঙ্গে ১৬ হাজার ১৩২ হেক্টর কৃষিজমি এবং ১ হাজার ৪১৭ হেক্টর আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। কৃষি খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২২২ কোটি টাকার বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ধানের বীজ, সার, পশুখাদ্য ও মাছের পোনা বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত এখনো সরকারি সহায়তা পাননি। ফলে ঘের ও খামার পুনর্গঠনে নতুন করে অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেই অর্থে পশুখাদ্য কিনে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যাকবলিত এলাকায় পশুর ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধে ইতোমধ্যে ৩৫ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, বন্যায় প্রায় ১৪৪ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা বা প্রণোদনা এলে উপজেলা পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা বিতরণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে নতুন বরাদ্দ এলে সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights