আরও চার জেলায় ছাত্রদল ছাত্রশিবির সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর তা ছড়িয়ে পড়েছে আরও চার জেলায়। ঢাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও গতকাল সংঘর্ষ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, পাবনা ও বরিশালে। জেলাগুলোর চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল বিনিময় ও মারধরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসব স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শুরু হওয়া সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, ঢাকা কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায়। নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে কোনো পক্ষ আবারও সংঘর্ষে জড়াতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি এবং মামলাও হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া ও কলেজ রোড এলাকায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ঘণ্টাখানেক দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে ছাত্রদল ও শিবিরের ২০ কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। তোলারাম কলেজ ছাত্রদল সভাপতি মনির হোসেন জিয়া বলেন, ‘তোলারাম কলেজে ৫ আগস্ট উপলক্ষে আলোচনা সভা ছিল। ছাত্রশিবির এখানে উচ্ছৃঙ্খল বক্তব্য দেয়। আমরা তাদের বলেছি এখানে উচ্ছৃঙ্খল বক্তব্য দেওয়া যাবে না। এ ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ছিল এবং আছে। তারা আমাদের একজনকে মেরে আহত করেছে।’

নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রশিবির সভাপতি অমিত হাসান বলেন, ‘আমরা মহানগর ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে জুলাই নিয়ে আমাদের কার্যালয়ে প্রোগ্রাম করছিলাম। এ সময় খবর পাই তোলারাম কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও অর্থ সম্পাদককে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা মারধর করেছেন। আমরা সেখানে গেলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সংঘর্ষ বাধে।’

সরকারি তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান ছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর শুনলাম গেটের বাইরে একজন আহত হয়েছে। ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পেরেছি। প্রশাসনকে জানানোর পর তারা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মো. হাছিনুজ্জামান বলেন, ‘তোলারাম কলেজে আলোচনা সভায় বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা, পরে হাতাহাতির একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন আয়োজিত সভায় পানিসম্পদমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনা করে শিবির নেতার দেওয়া বক্তব্যে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ছাত্রদল নেতা-কর্মীরা। একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও রাজনৈতিক নেতাদের সামনেই হট্টগোল সৃষ্টি হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে জামায়াত, শিবির ও এনসিপি নেতারা দাওয়াত পেলেও বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এ অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাননি। এ নিয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিতে এ ঘটনা ঘটে।

জেলা পুলিশ সুপার আবু তারেক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়েছে। তবে তেমন বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।’ বরিশাল থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও শিবির নেতা-কর্মীদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষ ঘটে। উভয় পক্ষই দাবি করেছে, সংঘর্ষে তাদের অন্তত ২০ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনকে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুর রহমান সিফাত বলেন, জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ চলাকালে শিবির বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে বাধা দিতে গেলে হামলার শিকার হন তাঁদের নেতা-কর্মীরা। এতে ১০-১২ জন আহত হন।

অন্যদিকে শিবিরের সাথি মো. আল আমিন দাবি করেছেন, জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত মিছিলের শেষ পর্যায়ে ছাত্রদল তাদের ওপর হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদি হাসান সোহাগ জানান, দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জেরে সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে শিক্ষক ও প্রশাসনের সদস্যরাও আহত হয়েছেন।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) প্রশাসন আয়োজিত জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবসের আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল ছাত্রদলের বিক্ষোভের মুখে পণ্ড হয়ে গেছে। যথাযথ দাওয়াত না পাওয়া এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের বাদ দিয়ে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসরদের’ উপস্থিতির প্রতিবাদে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেন শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় কনভেনশন সেন্টারে কর্মসূচিটি শুরু হয়। শহীদ মাহবুব হাসান নিলয়ের বাবা বক্তব্য শেষ করার পর ছাত্রদল সভাপতি মুজাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights