শিল্প, সাহিত্য ও সুরে সূর্যগ্রহণ

অনলাইন ডেস্ক

১২ আগস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে আগ্রহের পারদ চড়ছে। প্রাচীনকাল থেকেই এই মহাজাগতিক ঘটনাটি কেবল আকাশপ্রেমীদের মুগ্ধ করেনি, বরং রূপ নিয়েছে সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণায়। আদিম মানুষের ভয় ও অমঙ্গলের বার্তা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রোমান্টিক রূপক; গ্রহণের আলো-ছায়া স্থান করে নিয়েছে শিল্পকলা ও পপ কালচারের নানাবিধ সৃষ্টিতে।

মহাকাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানের কথাসাহিত্যে গ্রহণের উপস্থিতি বেশ জোরালো। হোমারের প্রাচীন মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসি’-তে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে রাজপ্রাসাদের বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা ঐতিহাসিকদের মতে খ্রিষ্টপূর্ব ১১৭৮ সালের বাস্তব এক সূর্যগ্রহণের ইঙ্গিত। একাদশ শতকের ফরাসি গাথা ‘সং অব রোল্যান্ড’-এ আকাশ অন্ধকার হয়ে যাওয়াকে শেষ বিচারের দিনের অমঙ্গলচিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মার্ক টোয়েনের ‘এ কানেকটিকাট ইয়ানকি ইন কিং আর্থার্স কোর্ট’ এবং এইচ রাইডার হ্যাগার্ডের ‘কিং সলোমনস মাইনস’ উপন্যাসে মূল চরিত্ররা সূর্যগ্রহণের পূর্বজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অলৌকিক ক্ষমতার নাটক তৈরি করে প্রাণ বাঁচায়।

বিশ্বখ্যাত লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ তার ডায়েরিতে ১৯২৭ সালের সূর্যগ্রহণের সেই অবিশ্বাস্য ও শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন। একইভাবে থ্রিলার সম্রাট স্টিফেন কিং তাঁর ডলোরেস ক্লেবর্ন ও জেরাল্ডস গেম উপন্যাসে ১৯৬৩ সালের বাস্তব সূর্যগ্রহণকে কাহিনীর মূল চালিকাশক্তি বানিয়েছেন। অন্যদিকে আইজ্যাক আসিমোভের বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান গল্প নাইটফল-এ ছয়টি সূর্যের গ্রহ লাকাশে হাজার বছর পর নেমে আসা অন্ধকারের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া অগস্তো মন্তেরোসোর ছোটগল্প দ্য এক্লিপস এবং অ্যানি ডিলার্ডের বিখ্যাত প্রবন্ধ টোটাল এক্লিপস-এ সূর্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাস্তবতা ও মানবদর্শনের চিত্র ফুটে উঠেছে।

রূপালি পর্দাতেও গ্রহণের রহস্যময় আবহাওয়া বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৬১ সালের রিশার ফ্ল্যাশার পরিচালিত মহাকাব্যিক সিনেমা ‘বারাব্বাস’-এর ক্রুশবিদ্ধ করার দৃশ্যটি সত্যি কারের সূর্যগ্রহণের সময় ইতালি জুড়ে ক্যামেরা বসিয়ে চিত্রায়িত করা হয়েছিল, যা সিনেমার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। সেই একই গ্রহণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনি তৈরি করেন তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘এক্লিপস’। আশির দশকের ফ্যান্টাসি ছবি ‘লেডিহক’-এ সূর্যগ্রহণ হয়ে ওঠে দুই অভিশপ্ত প্রেমিকের একসঙ্গে মানুষরূপে ফিরে আসার একমাত্র সুযোগ। মেল গিবসনের ‘অ্যাপোক্যালিপ্টো’ ছবিতে মায়ান পিরামিডে বলিদানের মুহূর্ত থেকে নায়কের বেঁচে যাওয়ার পেছনেও ছিল সূর্যগ্রহণের ভূমিকা। স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘ডলোরেস ক্লেবর্ন’ ও ‘জেরাল্ডস গেম’ চলচ্চিত্রেও সেই ঐতিহাসিক গ্রহণ ফিরে এসেছে। এছাড়া খাউমে বালাগেরোর হরর থ্রিলার ‘ডার্কনেস’ ও ‘ভেনাস’ এবং পাকো প্লাজার ‘ভেরোনিকা’ ছবিতে সূর্যগ্রহণকে রহস্যময় ও অলৌকিক ঘটনার প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সুর আর রূপকের বন্ধনে সূর্যগ্রহণ স্থান পেয়েছে জনপ্রিয় সব গানেও। বনি টাইলারের কালজয়ী গান টোটাল এক্লিপস অব দ্য হার্ট আজও যেকোনো গ্রহণের সময় বিশ্বজুড়ে বেজে ওঠে, যা এই মহাজাগতিক ঘটনার অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সংগীতে পরিণত হয়েছে। স্প্যানিশ ভাষায় লিসেটের কণ্ঠে এক্লিপস টোটাল দেল আমোর গানটিও বেশ পরিচিত। পিংক ফ্লয়েডের কালজয়ী অ্যালবাম ‘দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন’-এর সমাপনী গান এক্লিপস এবং কার্লি সাইমানের ইউ আর সো ভেইন গানেও রয়েছে গ্রহণের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ।

লাতিন সংগীতের আবহে নাতালিয়া লাফোরকাদের এক্লিপস এবং লুসিয়ানো পেরেইরার এক্লিপস দে লুনা চন্দ্রগ্রহণকে বিরহ ও ভালোবাসার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে পোস্ট-পাঙ্ক শিল্পী ক্লাউস নোমির টোটাল এক্লিপস ও ক্রিডেন্স ক্লিয়ারওয়াটার রিভাইভালের ব্যাড মুন রাইজিং গানে গ্রহণের অন্ধকার রূপ পেয়েছে প্রলয় ও মহাবিপর্যয়ের সংকেতে। অতি সম্প্রতি ইউরোভিশন ২০২৬-এ অস্ট্রেলিয়ার শিল্পী ডেল্টা গুডরেমের পরিবেশিত এক্লিপস গানটিতে আলো ও ছায়ার মিলনকে গভীর ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ইউরো নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights