ফার্মেসিতে কাজ করেও জিপিএ-৫, দর্জি বাবার মুখে হাসি ফুটালেন প্রান্ত
বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
সংসারের অভাব ছিল, ছিল অসুস্থ বাবার কাঁধে পরিবারের বাড়তি দায়িত্ব। বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দারিদ্র্যকে বাধা হতে দেননি প্রান্ত দেবনাথ। নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাতে দিনের একটি বড় সময় ফার্মেসিতে কাজ করেছেন। কাজের ক্লান্তি ভুলে রাতে বসেছেন বই নিয়ে। সেই সংগ্রামের পুরস্কার হিসেবে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি।
প্রান্ত দেবনাথ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর সরকারি এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাবা পঙ্কজ দেবনাথ পেশায় দর্জির কারিগর। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় বাবার আয়ও আগের মতো নেই। সেলাই মেশিনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল।
পরিবারের সেই বাস্তবতা বুঝতে পেরেই পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে কাজ শুরু করেন প্রান্ত। সকাল থেকে বিকেল কিংবা সন্ধ্য -কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও তার মাথায় ছিল একটাই লক্ষ্য, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে এবং ভালো ফল করতে হবে।
ফার্মেসির কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরেও থেমে থাকেনি তার পড়াশোনা। কখনো কাজের ফাঁকে, কখনো রাতে নিরিবিলি পরিবেশে বই নিয়ে বসেছেন। ঘুম ও বিশ্রামের চেয়ে স্বপ্নকেই বড় করে দেখেছেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে অভাব-অনটন।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রান্তের জিপিএ-৫ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পরিবারে নেমে আসে আনন্দের বন্যা। তবে সবার চেয়ে বেশি আনন্দিত তার বাবা পঙ্কজ দেবনাথ। ছেলের সাফল্যে দীর্ঘদিনের কষ্ট যেন মুহূর্তেই ভুলে গেছেন তিনি। অসুস্থ শরীরেও ছেলের অর্জনে তার মুখে ফুটে উঠেছে গর্ব আর প্রশান্তির হাসি।
প্রান্তের সাফল্যের গল্প শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক কিশোরের নীরব লড়াইয়ের গল্প। অর্থের অভাব, বাবার অসুস্থতা কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবন -কোনো কিছুই তার স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
প্রান্ত বলেন, ‘পরিবারের কষ্ট আমি দেখেছি। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেছি। অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু কখনো হাল ছাড়িনি। ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভালো কিছু করতে চাই এবং বাবা-মায়ের মুখে আরও হাসি ফোটাতে চাই।’
প্রান্তের এই সাফল্য শুধু তার পরিবারের আনন্দের কারণ নয়, বাঞ্ছারামপুরের অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্যও অনুপ্রেরণার। তার গল্প যেন বলে, সুযোগ সীমিত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন ও চেষ্টা সীমিত নয়।
