মিরাজ-হাসানের দৃঢ়তায় ধস সামলে চালকের আসনে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্টে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর ব্যাট হাতে দারুণ জবাব দিয়েছে টাইগাররা। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, মমিনুলের হকের ৪৯ ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের পর হঠাৎ ব্যাটিং ধসে কিছুটা চাপে পড়ে বাংলাদেশ। তবে শেষ পর্যন্ত মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদের দৃঢ়তায় সেই চাপ সামলে দ্বিতীয় দিন শেষ করেছে তারা।

দ্বিতীয় দিনশেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ১১০ ওভারে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশের লিড দাঁড়িয়েছে ১৫৩ রানে। মেহেদী হাসান মিরাজ ৭৩ বলে ৩২ রান করে অপরাজিত আছেন। তাঁর সঙ্গে ক্রিজে থাকা হাসান মাহমুদ ৭৬ বলে করেছেন ১৩ রান। দিনের শেষ বলে মিরাজের একটি ক্যাচও ফেলেছেন ক্যামেরন গ্রিন। ফলে স্বস্তি নিয়েই দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করেছে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দারুণ শুরু

প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের বোলারদের সামনে খুব বেশি সময় টিকতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন স্টিভ স্মিথ। এ ছাড়া ট্রাভিস হেড ২২, জেক ওয়েদারাল্ড ২৩, অ্যালেক্স ক্যারি ১৯ ও ক্যামেরন গ্রিন ১৩ রান করেন।

বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে হাসান মাহমুদ ছিলেন সবচেয়ে সফল। ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন তিনি। তাসকিন আহমেদ নেন ২ উইকেট। এবাদত হোসেনও শিকার করেন ২ উইকেট।

অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়তে থাকে। ৪৫ রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর ৫২ রানে দ্বিতীয়, ৬১ রানে তৃতীয় ও ৭৪ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় তারা। এরপরও স্টিভ স্মিথ কিছুটা প্রতিরোধ গড়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৮ রানেই শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস।

তানজিদ-মমিনুলের জুটিতে শক্ত ভিত

জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা খুব একটা স্বস্তির ছিল না বাংলাদেশের। ৩৬ রানে শাদমান ইসলাম ফিরে যান। তবে এরপর তানজিদ হাসান ও মমিনুল হক মিলে ইনিংসের ভিত শক্ত করেন।

দুজনের ব্যাটে আসে ১০২ রানের জুটি। মমিনুল ৯৫ বলে ৮ চারসহ ৪৯ রান করে ফিরে যান। এরপর তানজিদকে সঙ্গে নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।

তানজিদ তুলে নেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। ১৯৭ বলে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ১০১ রান করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ব্যাটারের এই ইনিংস দলকে বড় লিডের স্বপ্ন দেখায়।

শান্তর ৮৪ রানের পর হঠাৎ ধস

তানজিদ ২৩১ রানে ফিরে যাওয়ার পর শান্তর সঙ্গে মুশফিকুর রহিমের জুটি বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেয়। শান্তও এগোচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু ২৯৭ রানে এসে হঠাৎই ছন্দপতন ঘটে।

জশ হ্যাজেলউডের বলে স্টিভ স্মিথের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান শান্ত। ১২৬ বলে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৮৪ রান করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

শান্তর বিদায়ের পর দ্রুত আরও দুই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। লিটন দাস ১২ বল খেলে কোনো রান না করেই মিচেল স্টার্কের বলে স্টিভ স্মিথের হাতে ক্যাচ দেন। এরপর প্যাট কামিন্সের বলে একই ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন মুশফিকুর রহিম। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৫৫ বলে ৩৬ রান।

২৯৭ থেকে ৩০৮ রানের মধ্যে তিন উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন বড় ধাক্কার মুখে। ৩ উইকেটে ২৯৭ রান থেকে ৬ উইকেটে ৩০৮ রান হয়ে যায় দলের স্কোর। মাত্র ১১ রানে তিন উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে আবার ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ।

সেখানেই মিরাজ ও হাসানের প্রতিরোধ

ব্যাটিং ধসের পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল ইনিংস কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়। সেই জায়গায় দায়িত্ব নেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ।

দুজন মিলে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণ সামলে দিনের বাকি সময়টা কাটিয়ে দেন। মিরাজ ৭৩ বলে ৩২ রান করে অপরাজিত। তাঁর ইনিংসে আছে ৩টি চার। অন্যদিকে হাসান মাহমুদ ৭৬ বল মোকাবিলা করে ১৩ রান করেছেন। তাঁর ইনিংসে আছে দুটি চার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা নতুন বল নিয়ে আক্রমণে থাকার সময়ও এই জুটি উইকেট ধরে রাখে। একদিকে মিরাজ রান বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে হাসান মাহমুদ দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের হতাশ করেছেন।

দিনের শেষ বলেও মিরাজকে আউট করার সুযোগ পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। মার্নাস লাবুশেনের করা ওভারের শেষ বলে শর্ট ও অফের বাইরে থাকা বল কাট করেন মিরাজ। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে থাকা ক্যামেরন গ্রিন নিচে নামার চেষ্টা করেও ক্যাচটি ধরে রাখতে পারেননি। ফলে জীবন পান মিরাজ। এরপরই দ্বিতীয় দিনের খেলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

মিরাজ হাসানের এই জুটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের ইনিংসের দিকে তাকালে মিরাজ ও হাসানের জুটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ৩০৮ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের হাতে ছিল মূলত নিচের সারির ব্যাটাররা। এমন অবস্থায় আরও কয়েকটি দ্রুত উইকেট পড়লে লিড অনেকটাই কমে যেতে পারত।

কিন্তু মিরাজ ও হাসান অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে দীর্ঘ সময় টিকে থেকে দলকে ৩৫১ রানে নিয়ে গেছেন। শুধু রান নয়, তাদের ব্যাটিং বাংলাদেশের লিডকে ১৫৩ রানে নিয়ে গেছে।

বিশেষ করে হাসান মাহমুদের ব্যাটিং আলাদা করে নজর কেড়েছে। প্রথম ইনিংসে বল হাতে ৬ উইকেট নেওয়ার পর ব্যাট হাতেও দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ৭৬ বল খেলে ১৩ রান খুব বড় কোনো ব্যক্তিগত স্কোর নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তাঁর ৭৬ বলের প্রতিরোধের মূল্য অনেক বেশি।

মিরাজের ওপর এখন বড় দায়িত্ব

দিন শেষে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে আরও চার উইকেট। ক্রিজে থাকা মিরাজের ওপর তাই তৃতীয় দিনের শুরুতে বড় দায়িত্ব থাকবে। তাঁর সঙ্গে তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন ব্যাট করতে নামবেন।

মিরাজ যদি দিনের শুরুতে আরও কিছু রান যোগ করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের লিড আরও বড় হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১৯৮ রানের তুলনায় ইতোমধ্যে ১৫৩ রানের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের লক্ষ্য এখন যতটা সম্ভব বড় লিড নেওয়া।

অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজেলউড দুটি করে উইকেট নিয়েছেন। প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়ন নিয়েছেন একটি করে উইকেট।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ

প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দেওয়ার পর ব্যাট হাতে ৩৫১ রান করা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। বিশেষ করে তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, শান্তর ৮৪ ও মোমিনুলের ৪৯ রানের পর যখন দ্রুত তিন উইকেট পড়ে যায়, তখন মিরাজ ও হাসানের প্রতিরোধ দলকে আবার শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনে।

দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ ১৫৩ রানে এগিয়ে। হাতে রয়েছে চার উইকেট। এই অবস্থান থেকে তৃতীয় দিনের শুরুতে আরও কিছু রান যোগ করতে পারলে লিড দুইশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার জন্যও তৃতীয় দিনের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ। মিরাজ ও হাসানের জুটি দ্রুত ভাঙতে পারলে স্বাগতিকরা আবার ম্যাচে ফেরার সুযোগ পাবে। আর বাংলাদেশ যদি দিনের শুরুতে লিড আরও বাড়িয়ে নিতে পারে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপও বাড়বে।

বাংলাদেশের স্কোর ৬ উইকেটে ৩৫১ রান। মেহেদী হাসান মিরাজ ৩২ রানে অপরাজিত, হাসান মাহমুদ অপরাজিত ১৩ রানে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ছিল ১৯৮ রানের। ফলে বাংলাদেশ এগিয়ে ১৫৩ রানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights