বিদেশিদের নিয়েই যন্ত্রণা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রতিটি দেশেই ঘরোয়া ফুটবলে বিদেশিরা খেলে থাকেন। স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এরা সবাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। নিজেদের দেশেই তারকার ছড়াছড়ি। তারপরও দলের শক্তি বাড়াতে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করে। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যে, যাদের ঘরোয়া আসরে বিদেশি ফুটবলাররা খেলেন না। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা খ্যাতি পেয়েছেন অন্য দেশের ঘরোয়া ফুটবল খেলেই। বাংলাদেশেও বিদেশিদের ছড়াছড়ি। ১৯৭৪ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ লিগে প্রথম বিদেশি ফুটবলারের দেখা মেলে। সেবার ভারতের শ্রী প্রসাদ ও শ্রী মিশ্রকে উড়িয়ে আনে মোহামেডান। ১৯৭৭ সাল থেকেই নিয়মিত বলা যায়।

দলের শক্তি বাড়ানো ও সাফল্য পেতেই তো বিদেশিদের আনা হচ্ছে। বাংলাদেশে ঢাকা আবাহনী, মোহামেডান ও বসুন্ধরা কিংসে বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারও খেলে গেছেন। কথা হচ্ছে স্থানীয় তারকা থাকার পরও বিদেশি ফুটবলারের প্রয়োজন পড়ে কেন? এখানে শক্তি তো আছেই, শেখারও অনেক কিছু আছে। নালজেরগার, বিজন তাহেরি, ঝুকভ, পলিনকভ, পাকির আলি, এমেকা, রহিমভদের নৈপুণ্য দেখে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা কিছু তো শিখেছেন।

আবার এটাও স্বীকার করতে হবে বিদেশি ফুটবলার খেললে যেমন আসরের আকর্ষণ বাড়ে তেমনি দর্শকও বাড়ে। ১৯৭৪ সালে প্রসাদ বা মিশ্র খেললেও মোহামেডানের কোনো কাজে আসেনি। দিলকুশার বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলেছেন তাঁরা। এতেই গ্যালারি ভরে গিয়েছিল। কেননা বিদেশিরা কেমন খেলেন তা নিজ চোখে দেখতে হবে। এখন তো সেই অবস্থা নেই। বরং বিদেশিরা নানা কর্মকান্ড করে যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আগে অভিযোগ থাকলেও বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল চালু হওয়ার পর বিদেশিরা যা করছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। নিজেরা অনিয়ম করছেন, খেলা ফেলে যখন তখন দেশে যাচ্ছেন, ক্ষ্যাপ খেলছেন-সবই তাদের জন্য উন্মুক্ত। অথচ সামান্য বাকি থাকলে লঙ্কাকান্ড ঘটাচ্ছেন।

যেকোনো খেলোয়াড়কে দলে ভিড়ালে তো ক্লাবের চুক্তি করতে হয়। সেখানে পারিশ্রমিকের অর্থ লেখা থাকে। চুক্তি মোতাবেক অবশ্যই অর্থ দিতে হবে, এখানে কোনো ছাড় নেই। এখন বসুন্ধরা কিংস ও ঢাকা আবাহনীকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। হতেই পারে কেননা দুটি দল একাধিক ফিফার নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিল। এর মধ্যে কিংস ১৩ ও আবাহনীর তিনটি ব্যান। ভালো খেলুক বা না খেলুক চুক্তি অনুযায়ী অর্থ দিতেই হবে। নানা কারণে পেমেন্ট পরিশোধে বিলম্বিত হতেই পারে। ইউরোপিয়ান লিগেও হচ্ছে। ক্লাব এ ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের জন্য সময় নিয়ে থাকে। সেই সময়ের মধ্যে বকেয়া শোধ না করলেও আবার নতুন করে সময় নেওয়া হয়। এটা হয়ে থাকে ক্লাব ও ফুটবলারের সমঝোতার মাধ্যমে। এ অবস্থায় কেউ যদি ফিফার কাছে নালিশ করে বসে ওরা আমার টাকা দিচ্ছে না। চুক্তির কাগজপত্র ও অভিযোগপত্র দেখে বাফুফের ও ক্লাবের কাছে জানতে চায় ঘটনাটা ঠিক কি না?

ক্লাবগুলো স্বীকার করে ও টাকা পাবে। ফিফা এখানে সময় বেঁধে দেয় এতদিনের মধ্যে বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করলে ফুটবলের সব কর্মকান্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হবে। ফিফা কিন্তু জানতে চাইল না এ ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে বকেয়া পাওয়া খেলোয়াড়ের কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না। অথচ ক্লাবের বিমান ভাড়া দিয়ে তারা যে ক্লাবকে সময় দিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে সময় বাড়ানো হয়েছে তা থেকে যায় অন্ধকারে। ফিফা খেলোয়াড়ের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যান করে ফেলল। একটা সমঝোতা হয়েছে এটা জানার প্রয়োজনও মনে করল না। এমন সমঝোতায় স্টাম্পযুক্ত লিখিত হয়েছিল কি না সেটাই বড় প্রশ্ন। বিদেশিরা এটার সুযোগ নিয়েই ক্লাবগুলোকে নাজেহাল করে থাকে।

নাইজেরিয়ার ফুটবলার এমেকা আশির দশকে মোহামেডানে খেলেছিলেন। ঢাকার মাঠে তাঁর জনপ্রিয়তাও ছিল। মোহামেডানের ঘরের ছেলেই বৃনে গিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে এ নাইজেরিয়ান ফুটবলার পেশাদার লিগে মোহামেডানের

প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। নিজের আগ্রহে নাকি তিনি কোচ হয়েছিলেন। এতটা আপনজন ছিলেন যে, কর্মকর্তারা তাঁকে আর না করতে পারেননি। তবে চুক্তিও করা হয়েছিল। তাঁর প্রশিক্ষণে লিগে মোহামেডানের অবস্থান ছিল নিচের দিকেই। মৌসুম শেষে কিছু পেমেন্ট বাকি ছিল তাঁর। সমঝোতা হয়েছিল অর্থ জোগার হলেই মোহামেডান তা শোধ করবে। এর মধ্যে অনেকবার ঢাকা এসে মোহামেডানে সময়ও কাটিয়েছেন। সেই আপনজন এমেকায় কি না ফিফার কাছে নালিশ করে বসলেন মোহামেডান তাঁর লাখ লাখ টাকার পারিশ্রমিক বকেয়া দিচ্ছে না। ফিফাতে নালিশ, অর্থ না দিয়ে কি উপায় ছিল?

কেউ কেউ আবার বলেন, বিদেশিদের ফিফার নালিশ করতে মূলত ইন্ধন জোগান এজেন্টরা। কারণ টাকা পেলে এখান থেকে কমিশনও পেয়ে থাকেন। প্রখ্যাত ফুটবলার ও কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু বলেন, ‘এমন ঘটনা ঘটছে কি না তা আমার জানা নেই। তবে এখানে যে কিছু ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে তা আমি নিশ্চিত। দেখেন কোচ বা খেলোয়াড় বলেন অধিকাংশই আফ্রিকা

মহাদেশের। তারা কি ধরনের হতে পারেন তা কারোর অজানা নেই। ধরলাম পরিবেশ, পরিস্থিতির কারণে আবাহনী হয়তো অর্থ সংকটে আছে। তাই তাদের বেলায় তিনজনের অভিযোগ সত্যি হতেও পারে। সুখবর হচ্ছে তারপরও তারা বকেয়া শোধ করে ব্যান উঠিয়েছে। বসুন্ধরা কিংসের ১৩টি ব্যান এ যেন আমার কাছে কেমন ঠেকছে। যারা ক্রীড়া উন্নয়নে আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তুলেছে। যাদের নিজস্ব আধুনিক ফুটবল ভেন্যু, প্রশিক্ষণ মাঠ সবকিছু আছে। খেলোয়াড়রা যেখানে খেলাটা স্বপ্ন মনে করেন সেই ক্লাব এত জনের টাকা বাকি রাখবে বিশ্বাসই হচ্ছে না। জানি না এর ভিতরে কী আছে। দলকে টিকিয়ে রাখতে তারাও একের পর এক ব্যান প্রত্যাহার করছে। তারপরও ক্লাবগুলোর কাছে আমার পরামর্শ থাকবে চুক্তিটা এমনভাবে করবেন, যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে। মোহামেডান, শেখ রাসেল, শেখ জামাল, ফেনী সকার ও ফকিরেরপুল এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। স্থানীয়রা অর্থ না পেলেও ফিফার কাছে নালিশ করবেন না। তবে বিদেশিদের থেকে সতর্ক থাকুন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights