যমুনার তীরে দৃশ্যমান হচ্ছে সারিয়াকান্দি নদীবন্দর, কমবে বগুড়া-জামালপুর দূরত্ব

বিশেষ প্রতিনিধি, বগুড়া

দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যেন এবার বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে বগুড়ার সারিয়াকান্দিবাসীর। যমুনার তীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে সারিয়াকান্দি নদীবন্দর। সম্প্রতি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি প্লাটুন সারিয়াকান্দির কালিতলা নৌঘাটে অবস্থান নিয়েছে। ঘাট এলাকায় ‘সারিয়াকান্দি নদীবন্দর’ লেখা সাইনবোর্ড স্থাপন করায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা।

এর আগে গত ৮ জুলাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও ধুনট নদীবন্দরকে আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেটভুক্ত করে। উত্তরাঞ্চলের নৌযোগাযোগ উন্নয়ন, যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ এবং নদীবন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সারিয়াকান্দি নদীবন্দরের সংরক্ষক হিসেবে বিআইডব্লিউটিএকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং গেজেটের মাধ্যমে বন্দরের সীমানাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সারিয়াকান্দি নদীবন্দরের উত্তর সীমানা কালিতলা ঘাটের উত্তরে দিঘাপাড়া ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে যমুনা নদী পেরিয়ে পূর্ব তীরে জামথল ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ সীমানা ময়রাপাড়া ঘাট (দেবডাঙ্গা) এলাকা থেকে যমুনার পূর্ব তীরে মূলবাড়ী পর্যন্ত। বন্দরের আওতায় নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরে ভরা মৌসুমের সর্বোচ্চ পানি সমতল থেকে স্থলভাগের দিকে ৫০ গজ পর্যন্ত এলাকাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকেই বগুড়াসহ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের যোগাযোগে সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে বগুড়া ও জামালপুরের মানুষের জন্য যমুনা পারাপারের এ পথটি তুলনামূলক সহজ ও স্বল্পদূরত্বের।

বর্তমানে কালিতলা ঘাট থেকে মাদারগঞ্জের জামথল ঘাট পর্যন্ত নৌপথ স্থানীয়দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ছোট নৌকায় যমুনা পার হন। তবে এসব নৌযানে পর্যাপ্ত যাত্রীসুবিধা না থাকায় প্রখর রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়-বাতাসের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে যমুনায় ডুবোচর জেগে ওঠায় নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়।

নদীবন্দর প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় সুবিধা হবে বগুড়া ও জামালপুরের মধ্যে নৌযোগাযোগ সহজ হওয়া। বর্তমানে সড়কপথে বগুড়া থেকে জামালপুর যেতে সিরাজগঞ্জের যমুনা সেতু হয়ে প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অন্যদিকে বগুড়া শহর থেকে সারিয়াকান্দি নৌঘাটের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। কালিতলা ঘাট থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জের জামথল ঘাট পর্যন্ত নৌপথ এবং সেখান থেকে সড়কপথ মিলিয়ে মোট দূরত্ব প্রায় ৫৯ কিলোমিটার। ফলে নৌপথটি কার্যকরভাবে চালু হলে বগুড়া-জামালপুর যোগাযোগে প্রায় ১১৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে।

সারিয়াকান্দি সদরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীবন্দর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুধু ঘাটে সাইনবোর্ড স্থাপন নয়, নিয়মিত নৌযান চলাচল, নিরাপদ যাত্রী পারাপার, আধুনিক জেটি, যাত্রীছাউনি, পণ্য ওঠানামার ব্যবস্থা এবং নৌপথের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হবে—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, সারিয়াকান্দির যমুনার চরাঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। ধান, ভুট্টা, মরিচ ও বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদন করলেও উন্নত পরিবহনব্যবস্থার অভাবে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। নদীবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে কম খরচে দ্রুত এসব পণ্য বগুড়া, জামালপুরসহ আশপাশের বাজারে পাঠানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি গেজেট অনুযায়ী সারিয়াকান্দি নদীবন্দরের আওতায় যমুনার তীরবর্তী একাধিক ঘাট ও সংশ্লিষ্ট নৌপথ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দিঘাপাড়া, কালিতলা, ময়রাপাড়া (দেবডাঙ্গা), জামথল ও শোনপচাসহ বিভিন্ন ঘাট ও সংলগ্ন খাল রয়েছে। বন্দরের উন্নয়ন, জেটি নির্মাণ ও যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত বন্দরসীমার মধ্যে বিআইডব্লিউটিএর কর্তৃত্ব কার্যকর থাকবে।

বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ কাজি রফিকুল ইসলাম বলেন, নদীবন্দর সারিয়াকান্দিবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী আনন্দিত। নদীবন্দর চালু হলে নৌযোগাযোগে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএকে সারিয়াকান্দি নদীবন্দরের সংরক্ষক নিয়োগ ও সীমানা নির্ধারণ করায় স্থানীয়দের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। যমুনার তীরে ‘সারিয়াকান্দি নদীবন্দর’ লেখা এখন শুধু একটি নামফলক নয়, এটি স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights