কোস্টগার্ড সদস্যের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের নামে অপপ্রচারের অভিযোগ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় স্বজনদের মারধরের অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদটি প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক ভোরের আকাশ পত্রিকার কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি নুরনবী মিয়াকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে সংবাদ প্রকাশ করেন। এরপরই অভিযুক্ত ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে পোস্ট দেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই সাংবাদিক।
অভিযুক্ত মাহমুদ হাসান (৩০) কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর কলেজপাড়া এলাকার মো. মোসলেম উদ্দিনের (৫৮) ছেলে। তিনি নৌবাহিনীতে কর্মরত বলে জানা গেছে। তবে বর্তমানে তিনি নৌবাহিনী নাকি কোস্ট গার্ডে পদায়িত রয়েছেন এবং কোন দপ্তর বা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
সম্প্রতি আপন চাচা-চাচি ও চাচাতো ভাই-বোনকে মারধরের অভিযোগে মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পরই সাংবাদিককে নিয়ে ওই ফেসবুক পোস্ট দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দৈনিক ভোরের আকাশ-এর অনলাইন সংস্করণে ‘পূর্ববিরোধের জেরে কুড়িগ্রামে একই পরিবারের চার সদস্যকে মারধর’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর কলেজপাড়া এলাকায় পূর্ববিরোধের জেরে একই পরিবারের চার সদস্যকে মারধর এবং বাড়ির পেছনের বেড়া ভেঙে লোহার রড দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে। আহতরা কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়।
এর আগে বুধবার (১৯ আগস্ট) কুড়িগ্রাম সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন কৃষ্ণপুর কলেজপাড়া এলাকার মো. মনির হোসেন (৫৫)। অভিযোগে তিনি মাহমুদ হাসান, তার বাবা মো. মোসলেম উদ্দিন (৫৮) ও মিনারা বেগম (৬০)-কে অভিযুক্ত করেন।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পূর্ববিরোধের জেরে বুধবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে অভিযুক্তরা মনির হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং চরিত্রহননের মিথ্যা অপবাদ দেন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে একইভাবে গালিগালাজের প্রতিবাদ করলে মনির হোসেনের স্ত্রীকে মাহমুদ হাসান ও মোসলেম উদ্দিন এলোপাতাড়ি মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়। স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে মনির হোসেনকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিৎকার শুনে মনির হোসেনের ছেলে মো. সিনহা ইসলাম ও মেয়ে মোছা. মারুফা জান্নাত এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের রক্ষা করে বাড়িতে ঢুকে গেট বন্ধ করে দেন। এরপর মাহমুদ হাসান বাড়ির পেছনের বেড়া ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। এতে পরিবারের সদস্যদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত ও ফুলা জখম হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে এবং চিকিৎসার জন্য কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে পাঠায়। পরে থানায় লিখিত অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হলে মনির হোসেন বাদী হয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
মনির হোসেন বলেন, “অভিযুক্ত মাহমুদ হাসান আমার আপন বড় ভাইয়ের ছেলে। সে নৌবাহিনীতে চাকরি করে। তিন দিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেই পরিবারের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। সে যতবার ছুটিতে আসে, ততবারই আমার বাড়িতে এসে পরিবারের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়। এর আগেও একাধিকবার হামলা করেছে। এবার আমাকে, আমার স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে মারধর করে আহত করেছে। বর্তমানে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
অভিযোগ অস্বীকার করে মাহমুদ হাসান বলেন, বুধবার বিকেলে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে তিনিও ব্যথিত। কথা কাটাকাটি থেকেই ঘটনার সূত্রপাত এবং পরে মারামারি হয়েছে। এতে তিনিও আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার চাচাদের বিরুদ্ধেও তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, মনির হোসেন ও মোসলেম উদ্দিন দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জমিজমাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হয়। এর আগেও একাধিকবার দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে এবং মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার বিকেলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। পরে উভয় পক্ষই আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় এবং থানায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে।
কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ কামাল হোসেন বলেন, “গতকাল রাতে উভয় পক্ষ থেকেই থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। আমরা দুই পক্ষের অভিযোগই গ্রহণ করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, মারধরের অভিযোগে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্ত মাহমুদ হাসানের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিক জানান, সংবাদটি কোনো ব্যক্তিগত লেনদেন বা অর্থের বিনিময়ে নয়; বরং ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগ, চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকাশ করা হয়েছে।
সাংবাদিকের দাবি, সংবাদ প্রকাশের আগে অভিযুক্ত মাহমুদ হাসানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সরাসরি দেখা করতে চান। পরে দেখা হলে সংবাদটি প্রকাশ না করার শর্তে প্রথমে এক হাজার টাকা, পরে দেড় হাজার এবং সর্বশেষ দুই হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সাংবাদিক ওই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় বক্তব্য সংগ্রহ করে সংবাদ প্রকাশ করেন। এরপরই ক্ষুব্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে বলে সাংবাদিকের অভিযোগ।
