যুদ্ধজাহাজের ‘সংকট’ নিয়ে খবরই কি কাল হলো? হঠাৎ মার্কিন সামরিক পত্রিকার প্রকাশকের পদত্যাগ
অনলাইন ডেস্ক
মার্কিন সামরিক বাহিনীভিত্তিক সংবাদপত্র স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের দীর্ঘদিনের প্রকাশক ম্যাক্স ডি. লেডেরার জুনিয়র পদত্যাগ করেছেন। প্রতিরক্ষা বিভাগের নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণেই তিনি পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। মঙ্গলবার কর্মীদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান লেডেরার। একই বিষয়ে তিনি স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও কথা বলেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদপত্রটির সম্পাদকীয় কার্যক্রমে মার্কিন সরকারের আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে লেডেরারের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া স্মারকে লেডেরার বলেন, নেতৃত্বের বিষয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের মূল্যবোধ ও দায়িত্ব সম্পর্কে তার ধারণার সঙ্গে প্রতিরক্ষা বিভাগের নেতৃত্বের পরিকল্পনার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সংবাদপত্রটির বিরুদ্ধে ‘বিভ্রান্তি’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছিলেন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাজুক পরিস্থিতি এবং নাবিকদের কমে যাওয়া মনোবল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনার মুখেও পড়ে পত্রিকাটি।
১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। পত্রিকাটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি অর্থায়ন পেলেও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা প্রশাসনের চাপের মধ্যেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর সরকারি চাপ বেড়েছে বলে সমালোচকদের দাবি। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পেন্টাগন স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের সরকারি অর্থায়ন বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প অবশ্য বলেছিলেন, তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পত্রিকাটির বাজেট কমানো হবে না। তিনি এটিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য তথ্যের ‘চমৎকার উৎস’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জানুয়ারিতে প্রতিরক্ষা বিভাগ সংবাদপত্রটিকে সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেয়। একই সময়ে পেন্টাগন স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের ওমবাডসম্যান জ্যাকলিন স্মিথকে বরখাস্ত করে। সংবাদ প্রকাশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঠেকানো ও অভিযোগ যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল তার ওপর।
স্মিথকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় সমালোচনা শুরু হয়। বরখাস্তের পর এক কলামে স্মিথ লিখেছিলেন, কংগ্রেসের দেওয়া দায়িত্ব অনুযায়ী স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা একমাত্র ব্যক্তিকেই সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, হেগসেথ পেন্টাগনে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারও সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
বর্তমানে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ সরাসরি যুক্ত। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। দেশটিতে এই যুদ্ধ ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান মার্কিন সেনা ও গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ তৈরি করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে মার্কিন নাবিকদের মনোবল কমে যাওয়া এবং আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা দুটি সামরিক সংবাদমাধ্যমের একটি ছিল স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস।
দীর্ঘ সময় বন্দর ছাড়াই মোতায়েন থাকার ক্ষেত্রেও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মার্কিন নৌবাহিনীর রেকর্ড ভেঙেছে। গত নভেম্বরে বন্দর ছাড়ার পর রণতরীটিকে প্রথমে ভেনেজুয়েলার উপকূলে এবং পরে ইরানের কাছাকাছি এলাকায় পাঠানো হয়।
যুদ্ধ নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে ট্রাম্প ও তার মিত্রদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে সংবাদপত্রটি। সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা সাংবাদিকদের দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, তারা দেশের ব্যর্থতা দেখতে চান।
