সব গবেষণা বদলে দিয়েছে হড়পা বান

বিবেক কানডেল, নেপাল থেকে

নেপালে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্যোগ সব ধরনের স্বাভাবিক হিসাবনিকাশ বা গাণিতিক সীমার বাইরের এক চরম ব্যতিক্রমী ঘটনা। এটি সত্যিই অকল্পনীয়। ঝুঁকি নিরূপণের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেসব প্রথাগত কাঠামো বা পূর্বাভাস মডেল ব্যবহার করে, এই সংকট সেগুলোর কোনোটির সঙ্গেই খাপ খায় না।

নেপাল সরকারের অবকাঠামো ও জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন কৌশলবিদ বিবেক কানডেল বাংলাদেশ প্রতিদিনের জন্য বিশেষ লেখায় এ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা এখন এমন সব অনিশ্চিত ও চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি, যা আগে কখনো দেখা যায়নি বা যার কোনো পূর্বাভাস ছিল না। নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেওয়ার মডেলগুলোতে যে সাধারণ বিন্যাস বা ‘বেল কার্ভ’ অনুসরণ করা হয়, তার সম্পূর্ণ বাইরে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো হয়তো আপনারা ইতোমধ্যেই দেখেছেন। সেখানকার দৃশ্যপট মহাপ্রলয়ঙ্করী পরিস্থিতির মতো।

শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত প্রকৌশলী ও প্রকল্পের কর্মীসহ প্রায় ১৫৮ জন মানুষ ত্রিশূলী ৩বি (Trishuli 3B) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের ভিতর আটকা পড়ে ছিলেন। প্রকল্পটির অবস্থান সীমান্ত থেকে ভাটির দিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। ২৭ আগস্ট আরেকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে প্রায় ৩০০ জন প্রযুক্তিবিদ ও কর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এক ডজনেরও বেশি জলবিদ্যুৎ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১৫ শতাংশ অচল হয়ে পড়েছে। অনেক সেতু ও ঘরবাড়ি পানির তোড়ে ভেসে গেছে। সেখানে আটকাপড়া মানুষদের পরিচিতজনদের কাছ থেকে ক্রমাগত ফোন আসছে। চারদিকে এক চরম অসহায়ত্ব ও হাহাকার বিরাজ করছে।

সত্যি বলতে, আমরা এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। আমাদের বসতি, জীবিকা এবং মূলত আমাদের সমগ্র অবকাঠামো ভৌগোলিকভাবে এই নদী উপত্যকাগুলোর ওপরই গড়ে উঠেছে। আপনারা নিশ্চয়ই পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া একটি কংক্রিটের সেতু স্রোতের ধাক্কায় ভেসে গিয়ে ভাটির দিকের আরেকটি সেতুর ওপর সজোরে আছড়ে পড়ছে সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্যটি দেখেছেন। সাধারণ বন্যা এক বিষয়, কিন্তু পৃথিবীর কোনো প্রকৌশলগত অবকাঠামোই সাধারণত এমন প্রচণ্ড গতির ও শক্তির (কাইনেটিক লোড) আঘাত সামলানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয় না।

পরিকল্পনার সাধারণ মডেলগুলো এমন সব পরিস্থিতির জন্য তৈরি করা হয় যার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। যেমন স্বাভাবিক মৌসুমি বৃষ্টিপাত বা পানির উচ্চতা বাড়ার প্রত্যাশিত চক্র, যা সামলানোর মতো করেই কোনো সেতুর প্রকৌশলগত নকশা করা যায়। এমনকি বিরল ও বিশাল আকারের ‘শতবর্ষী বন্যা’ (যা প্রতি ১০০ বছরে একবার হতে পারে) তাও প্রযুক্তিগতভাবে প্রথাগত ঐতিহাসিক প্রত্যাশার সীমার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা (GLOF) আমাদের পরিকল্পনার সেই প্রথাগত মডেলগুলোকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। এখানে আমরা কেবল পানির উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে কথা বলছি না। এটি হলো বিশাল সব পাথরখণ্ড ও শিলাখণ্ডের এক তীব্র গতির স্রোত যা খাড়া পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে আসছে। সীমান্তের ওপারে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি আমাদের উপত্যকাগুলোকে যেন এক সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। যখন কোনো উন্নয়ন করিডরকে প্রভাবিত করার মূল কারণগুলো পুরোপুরি আন্তঃসীমান্ত প্রকৃতি এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত, তখন স্থানীয় পর্যায়ের কোনো প্রস্তুতিই সেটিকে সুরক্ষা দিতে পারে না।

বিবেক কানডেল : অবকাঠামো ও জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ এবং উন্নয়ন কৌশলবিদ, নেপাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights