হিমবাহ থেকে বছরে যে পরিমাণ পানি গলছে, তাতে ১২০০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে বিশাল শহর

অনলাইন ডেস্ক

এশিয়ার উঁচু পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহগুলো থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ বরফ গলে পানি হয়ে বের হচ্ছে, তার পরিমাণ বোঝাতে অবাক করার মতো একটি হিসাব দিয়েছেন এক মার্কিন বিজ্ঞানী। তাঁর মতে, বছরে এসব হিমবাহ থেকে গলে যাওয়া পানি দিয়ে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন দ্বীপকে প্রায় ১২০০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে দেওয়া সম্ভব।

কলোরাডো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড্যান ম্যাকগ্রাথ সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, এশিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ৯৫ হাজার হিমবাহ রয়েছে। সবগুলো মিলিয়ে এসব হিমবাহ যে এলাকা জুড়ে রয়েছে, তার আয়তন প্রায় দক্ষিণ কোরিয়ার সমান।

ম্যাকগ্রাথ বলেন, এসব হিমবাহ খুব দ্রুত তাদের বরফের ভর হারাচ্ছে। প্রতিবছর গলে যাওয়া পানির পরিমাণের ব্যাপকতা বোঝাতে তিনি বলেন, যেন প্রতিবছর ম্যানহাটনের ওপর ১২০০ ফুটের বেশি উচ্চতার পানির স্তর জমছে।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য বিষয়টি আরও সহজ করে বললে, ১২০০ ফুট উচ্চতা একটি সাধারণ বহুতল ভবনের কয়েকশ তলার সমান। অর্থাৎ বিজ্ঞানীর এই তুলনা শুধু বিপুল পরিমাণ পানির ধারণা দেওয়ার জন্যই নয়, হিমবাহ গলার মাত্রা কতটা বড় হয়ে উঠেছে, সেটিও বোঝায়।

নেপাল চীন সীমান্তে গত বুধবারের ভয়াবহ দুর্যোগের পর হিমবাহ গলার এই চিত্র আবারও সামনে এসেছে। ওই দিন লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছাকাছি একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে পড়ে। এরপর তীব্র ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পরে সিএনএনের পক্ষ থেকে অবস্থান শনাক্ত করে যাচাই করা হয়। ভিডিওতে নেপাল চীন সীমান্তের কাছে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে নিচে নেমে আসতে দেখা যায়।

স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, পাহাড়ের অনেক ওপরে থাকা হিমবাহের একটি বিশাল অংশ নদীর দিকে ধসে পড়ে। সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বরফের ওই অংশ প্রায় ৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।

ধসে পড়া হিমবাহের অংশটির প্রস্থ ছিল প্রায় ২ হাজার ফুট। এর পাশের প্রায় একই আকারের একটি পাথুরে অংশও ধসে পড়ে। এতে পাহাড়ের গায়ে প্রায় ৩ হাজার ফুট প্রশস্ত একটি ক্ষত তৈরি হয়েছে বলে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণে জানা গেছে।

ঘটনাটির শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস এটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে নথিবদ্ধ করেছিল। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই ভূকম্পনের সংকেত আসলে ভূমিধস থেকেই তৈরি হয়েছিল।

হিমবাহ ধসের পর বরফ, পানি ও পাথরের বিশাল স্রোত নদীর দিকে ছুটে আসে। প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জেফরি কারগেলের হিসাব অনুযায়ী, এই ঢল প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ ঘণ্টায় গড়ে ১৯৩ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করে।

অর্থাৎ মাত্র ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে প্রায় ১৪ মাইল পথ পাড়ি দেয় ওই ধ্বংসের স্রোত। বরফ ও পাথর গুঁড়িয়ে পানির সঙ্গে মিশে যাওয়ায় ঢলটির ধ্বংসক্ষমতাও ছিল অত্যন্ত বেশি।

বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি, ঠিক কী কারণে হিমবাহের ওই অংশ ভেঙে পড়েছিল। তবে এশিয়ার হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

উচ্চ পার্বত্য এ অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নয়, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ সেই ঝুঁকির ভয়াবহ একটি উদাহরণ সামনে এনেছে।

ম্যাকগ্রাথের দেওয়া হিসাবের মূল বার্তা হলো, হিমবাহ হারানোর পরিমাণ এখন আর শুধু পাহাড়ি এলাকার সমস্যা নয়। এসব বরফের মজুদ এশিয়ার বহু নদীর পানির অন্যতম উৎস। ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব বিস্তৃত অঞ্চলের পানি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনে পড়তে পারে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights