ডিজিটাল ব্যবস্থার বাইরে নৌপথে পণ্য পরিবহন
আলী রিয়াজ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহন খাত দেশের অবকাঠামো ও নির্মাণ কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। বালু, পাথর, কয়লা ও নির্মাণসামগ্রীর মতো বাল্ক পণ্য পরিবহনে দীর্ঘদিনের মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভরতা, খণ্ডিত তথ্যব্যবস্থা এবং অদক্ষ অপারেশনাল প্রক্রিয়ার কারণে তৈরি হচ্ছে কাঠামোগত অদক্ষতা। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময় ও জ্বালানিরও অপচয় হচ্ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের কার্গো ও বাল্ক লজিস্টিকস বাজারের আকার প্রায় ৬ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বালু, পাথর, কয়লা ও নির্মাণসামগ্রীকেন্দ্রিক বাল্ক কার্গো খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আকার আনুমানিক ৩ দশমিক ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার। ডিজিটালাইজেশন না থাকার কারণে বর্তমানে জাহাজ ও পণ্যের মধ্যে ম্যাচিংয়ের বড় একটি অংশ ম্যানুয়ালি সম্পন্ন হয়। ফলে উপযুক্ত জাহাজ খুঁজে পাওয়া এবং পণ্য পরিবহনের সিদ্ধান্ত নিতে ১২ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ ধরনের প্রক্রিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ধীর করার পাশাপাশি ব্যবস্থাটিকে অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক ও তথ্যনির্ভরতার বাইরে রাখছে। রুট নির্বাচন ও অপ্টিমাইজেশনের ঘাটতির কারণেও জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অদক্ষ রুট ব্যবস্থাপনার কারণে জ্বালানি ব্যবহারে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক নৌপথের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা খাতটির কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ডিজিটাল ফ্রেইট ম্যাচিং ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ ও পণ্য সরাসরি যুক্ত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। স্বয়ংক্রিয় বুকিং ও ম্যাচিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয় প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে। বর্তমানে দেশের লজিস্টিক ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশের সমান বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ কার্গো পরিবহনের প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ নৌপথনির্ভর। ডিজিটাল ও ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু হলে সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যয় প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে জাতীয় পর্যায়ে বছরে আনুমানিক ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহত্তর লজিস্টিক ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ ২৫ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সাশ্রয় হওয়া অর্থ অবকাঠামো, নির্মাণ ও উৎপাদনশীল খাতে পুনঃবিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি এ ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্মভিত্তিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে শিপকনেক্স (ShipConex)। এই উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী হাসনাইন হক ইজাজ চৌধুরী বলেন, বর্তমান নৌপথের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশনের কারণে পরিবহন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত প্রায় ৮ থেকে ২০ শতাংশ চাপ তৈরি হয়। সরাসরি জাহাজ ও পণ্য পরিবহনকারীদের মধ্যে সংযোগ না থাকায় অপ্রয়োজনীয় রিটার্ন ট্রিপের কারণে জাহাজের ধারণক্ষমতার প্রায় ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া তথ্য প্রবাহ না থাকায় পুরো সিস্টেমটি মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভর হয়ে পড়েছে। পুরো লজিস্টিক নেটওয়ার্কে অনিশ্চয়তা ও বিলম্ব তৈরি করছে। একটি ডেটা-ভিত্তিক লজিস্টিক সিস্টেমে ভেসেল রেজিস্ট্রি, রুট ইনফরমেশন, ট্রিপ হিস্ট্রি এবং বাজারভিত্তিক মূল্য তথ্য একত্রে বিশ্লেষণযোগ্য হলে দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
