হোটেল না পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফুটপাতেই রাত কাটাচ্ছেন চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা

দীপক দেবনাথ, কলকাতা

কলকাতার নিউ মার্কেটের পর এবার ঠাকুরপুকুর এলাকাতেও আবাসিক হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। থাকার জায়গা না পেয়ে অনেক বাংলাদেশি রোগী ও পরিবারের সদস্যকে হাসপাতালের আশপাশের ফুটপাত ও দোকানের শেডের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে।

কলকাতার ঠাকুরপুকুরে অবস্থিত ডা. সরোজ গুপ্ত ক্যান্সার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, যা ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও নিয়মিত বহু রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।

তবে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নির্দেশে ঠাকুরপুকুর এলাকার অধিকাংশ আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা পড়েছেন বিপাকে।

বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালের বাইরে গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাত ও বিভিন্ন দোকানের শেডের নিচে রোগী ও তাদের স্বজনদের অনেকেই অবস্থান করছেন। কেউ বসে ছিলেন, আবার কেউ মশার উপদ্রব ও নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে সেখানেই শুয়ে ছিলেন।

এক বাংলাদেশি নারী বলেন, ‘এখানে মশা-মাছির অনেক উপদ্রব। শৌচাগারেরও ব্যবস্থা নেই। সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আসার পর কেউ আমাদের এই সমস্যার কথা জানায়নি। এখানে এসে এত টাকা-পয়সা খরচ করার পর এখনই ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। হোটেলে থাকার সব ব্যবস্থা থাকলেও তারা আমাদের রাখতে চাইছে না।’

ক্যান্সারে আক্রান্ত আরেক নারী জানান, গত দুই দিন তিনি কলকাতার পিজি হাসপাতালের সামনে একটি হোটেলে ছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল অনেক দূরে হওয়ায় নিয়মিত যাতায়াত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। পরে থাকার জায়গা না পেয়ে রাস্তায় অবস্থান করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একদিন থাকার সুযোগ দিয়েছিল, পরে বের করে দেয়। পুলিশকে জানালেও তারা এখানে থাকতে নিষেধ করেছে। স্থানীয় সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, অন্তত রোগীদের কথা বিবেচনা করে গেস্ট হাউসগুলো খুলে দেওয়া হোক।’

পরিস্থিতি বিবেচনায় গত কয়েকদিন ধরে মানবিক কারণে রোগী ও তাদের স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছে ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের নিজস্ব পরিকাঠামো ও সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনদের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে বুধবার কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. অর্ণব গুপ্ত। এর পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন মিশনের কর্মকর্তারা। তারা হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পাশাপাশি চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি রোগী এবং হাসপাতাল চত্বরে সাময়িক অবস্থান করা রোগীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় মিশনের কর্মকর্তারা হোটেল সমস্যায় পড়া বাংলাদেশি রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মিশন কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও স্থান সংকুলানের সমস্যায় পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি রোগীদের ভর্তি নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। এমনকি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশিদের ভিসা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আরোপ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ অবস্থায় মিশনের পক্ষ থেকে রোগী ও স্বজনদের নিকটবর্তী কোনো হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য মিশন কর্তৃপক্ষ হোটেলের একটি তালিকা দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

তবে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, মিশনের দেওয়া তালিকায় থাকা হোটেলগুলোর নম্বরে যোগাযোগ করেও অনেক ক্ষেত্রে থাকার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো হোটেল থেকে বলা হচ্ছে কক্ষ নেই, আবার কোনো প্রতিষ্ঠান জানাচ্ছে তারা বিদেশিদের থাকার ব্যবস্থা করে না। কয়েকটি হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশ প্রশাসনের চাপ থাকার কথাও জানিয়েছে বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।

ফলে বৃহস্পতিবার বিকেলে মিশন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পরও রাতে থাকার জায়গা না পেয়ে অনেকেরই শেষ পর্যন্ত ফুটপাতেই আশ্রয় নিতে হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরপুকুর এলাকায় আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউস রয়েছে প্রায় ৩৫টি। এর প্রায় সবই বর্তমানে বন্ধ। হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনার কারণেই তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এর আগে গত ১৯ আগস্ট কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে নিউ মার্কেটসহ মধ্য কলকাতার একাধিক হোটেল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত কলকাতায় প্রায় চার শতাধিক হোটেলের দরজায় তালা পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশি নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি পর্যটক ও চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা রোগী-স্বজনরা নতুন করে আবাসন সংকটে পড়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights