তিন সন্তান হত্যার দায় স্বীকার মায়ের, তবুও রায় দিতে পারল না মার্কিন আদালত

অনলাইন ডেস্ক

ম্যাসাচুসেটসের তিন সন্তান হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে দোষী বা নির্দোষ- কোনোটিই সাব্যস্ত করতে পারেননি জুরিরা। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় শুক্রবার মামলাটিতে মিসট্রায়াল ঘোষণা করেছেন বিচারক উইলিয়াম সুলিভান।

ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই মামলায় রায় নিয়ে সাত দিন ধরে আলোচনা করেন ১২ সদস্যের জুরি। প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনা শেষে একজন জুরি ক্ল্যান্সিকে খালাস দেওয়ার বিষয়ে একমত না হওয়ায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি প্যানেলটি।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে ফৌজদারি মামলায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে জুরিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাই মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারলে তাকে ‘হাং জুরি’ বলা হয় এবং বিচারক মিসট্রায়াল ঘোষণা করতে পারেন। এর ফলে ক্ল্যান্সি খালাসও পাননি, আবার দোষীও সাব্যস্ত হননি।

সন্তান হত্যার ঘটনা

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৩ সালে ম্যাসাচুসেটসে নিজেদের বাড়িতে ক্ল্যান্সি তার তিন সন্তানকে হত্যা করেন। নিহতরা হলো ৫ বছর বয়সী কোরা, ৩ বছর বয়সী ডসন এবং ৮ মাস বয়সী ক্যালান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্তানদের গলায় ব্যায়ামের ব্যান্ড পেঁচিয়ে হত্যার পর ক্ল্যান্সি নিজেকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। পরে বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন ক্ল্যান্সি।

সন্তানদের হত্যার ঘটনাটি ক্ল্যান্সি অস্বীকার করেননি। তবে আদালতে তিনটি ফার্স্ট-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন তিনি। তার আইনজীবীদের বক্তব্য, সন্তানদের হত্যার সময় ক্ল্যান্সি প্রসবোত্তর সাইকোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। এ কারণে ওই সময় তার নিজের কর্মকাণ্ডের ওপর স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং তাকে ফৌজদারি দায়ে দোষী করা উচিত নয়।

বর্তমানে ৩৬ বছর বয়সী সাবেক নার্স ক্ল্যান্সি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হেফাজতে রয়েছেন।

জুরিদের মধ্যে মতবিরোধ

রায় নিয়ে জুরিদের আলোচনার শেষ পর্যায়ে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ল্যান্সির আইনজীবী কেভিন রেডিংটন অভিযোগ করেন, একজন জুরি ‘যুক্তিসংগত সন্দেহ’ নিয়ে আদালতের দেওয়া নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না। ওই জুরিকে সরিয়ে দেওয়ার আবেদনও করেন তিনি।

তবে বিচারক সুলিভান সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর জুরিদের আবার আলোচনায় পাঠানো হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা বিচারকের কাছে ফিরে জানান, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

এর পরই মিসট্রায়াল ঘোষণা করেন বিচারক। জুরিদের দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রেডিংটন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিলের চেষ্টা করেন। মামলার রায় স্থগিত রাখার আবেদন নিয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটসের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। তবে আদালত তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

ক্ল্যান্সির আইনজীবী পরে জানান, মিসট্রায়াল পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি আবার আবেদন করবেন। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী শুনানিতে আলোচনা হতে পারে।

আবারও বিচার হতে পারে

মিসট্রায়াল ঘোষণার অর্থ মামলাটি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। ক্ল্যান্সির বিরুদ্ধে তিনটি হত্যার অভিযোগ বহাল রয়েছে। এখন প্রসিকিউশন চাইলে একই অভিযোগে নতুন করে বিচার শুরু করতে পারে। আবার চাইলে মামলাটি সমঝোতার মাধ্যমেও নিষ্পত্তির চেষ্টা করতে পারে।

আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হয়েছে। সেদিন প্রসিকিউশনের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা পাওয়া যেতে পারে।

প্লাইমাউথ কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি টিমোথি ক্রুজ জানিয়েছেন, নতুন করে বিচার করা হবে কি না, তা নিয়ে তারা আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, তাদের বিশ্বাস, সন্তানদের হত্যার সময় ক্ল্যান্সি নিজের কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং এ বিষয়ে মামলায় প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, আদালতের বাইরে রেডিংটন দাবি করেন, একজন জুরির আপত্তি না থাকলে বাকি ১১ জন ক্ল্যান্সির পক্ষে রায় দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তবে জুরিদের অভ্যন্তরীণ আলোচনা গোপনীয় হওয়ায় এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে

ক্ল্যান্সির মামলাটি শুধু আদালতকেন্দ্রিক থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রসবোত্তর সাইকোসিস এবং সন্তান হত্যার ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতার দায় নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে।

বিচারের কার্যক্রম অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রতিদিন ২০০-র বেশি সাংবাদিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ক্ল্যান্সির সমর্থকেরাও বিভিন্ন সময়ে আদালতের বাইরে জড়ো হন।

মামলাটি নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ঘটনাটিকে ‘ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ক্ল্যান্সির কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি এবং ধারণা দেন, মামলাটির আবার বিচার হতে পারে।

এদিকে মিসট্রায়ালের পর ক্ল্যান্সির ভবিষ্যৎ আইনি অবস্থান এখন নির্ভর করছে প্রসিকিউশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। সেপ্টেম্বরের শুনানিতে সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসতে পারে।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights