৯/১১: এক হামলাতেই চিরতরে বদলে গেল বিশ্ব রাজনীতি, ফাঁদে পড়ল আমেরিকা

অনলাইন ডেস্ক
আমেরিকায় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঘটা শতাব্দীর ভয়াবহতম ট্র্যাজেডির আড়াই দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু চার উড়োজাহাজ আর ১৯ ছিনতাইকারীর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধসিয়ে দেওয়ার সেই ঘটনার রেশ আজও বিশ্বজুড়ে একইভাবে টাটকা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ হঠাৎ আছড়ে পড়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে। প্রথম মুহূর্তে অনেকেই এটি নিছক দুর্ঘটনা ভাবলেও ঠিক ১৭ মিনিট পর সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত হানলে গোটা বিশ্ব বুঝে যায়; এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা। নর্থ টাওয়ারে আঘাতের পরপরই আকাশে দেখা যায় আগুনের বিশাল কুণ্ডলী এবং শহরজুড়ে নেমে আসে ধুলার আস্তরণ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, ভবন থেকে মানুষ লাফিয়ে পড়ছিল, রাস্তায় ধুলোয় ঢাকা মানুষ ছুটে পালাচ্ছিল এবং চারদিকে ছিল শুধু আর্তচিৎকার। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অফিসকর্মী, পর্যটক, এমনকি স্কুলশিশুও। বিপদ যখন একের পর এক নেমে আসছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তখন ক্ষমতায় মাত্র ৯ মাস, নিউইয়র্কের মেয়র রুডি জুলিয়ানির মেয়াদও শেষের পথে। বেসবল তারকা ডেরেক জিটার তখনো নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিজের অধিনায়ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় গানের সাপ্তাহিক তালিকা ‘বিলবোর্ড হট ১০০’-এর শীর্ষে জেনিফার লোপেজ ও জা রুলের গান ‘আই’ম রিয়েল’ অবস্থান করছিল। ঘটনাক্রমে সেদিন ছিল নিউইয়র্ক শহরের প্রাইমারি নির্বাচনের দিনও, সকাল ছয়টায় ভোটকেন্দ্র খোলার কয়েক ঘণ্টা পরই ঘটে এ ট্র্যাজেডি।

সেদিনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল চরম আতঙ্কের। চারটি উড়োজাহাজ একযোগে ছিনতাই হয়েছিল এবং প্রতিটির গন্তব্য ছিল আলাদা। সকাল ৭টা ৫৯ মিনিটে বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭৬ যাত্রী, ১১ ক্রু এবং ৫ ছিনতাইকারীসহ উড়াল দেয় আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১, যা সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে নর্থ টাওয়ারে আছড়ে পড়ে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে একই বিমানবন্দর থেকে ৫১ যাত্রী, ৯ ক্রু ও ৫ ছিনতাইকারী নিয়ে উড়াল দেয় ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ এবং সকাল ৯টা ৩ মিনিটে সেটি সাউথ টাওয়ারে আঘাত হানে। এরপর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ওয়াশিংটনের ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৫৩ যাত্রী, ৬ ক্রু ও ৫ ছিনতাইকারী নিয়ে ওড়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭, যা সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদর দফতর পেন্টাগনে। সকাল ৮টা ৪২ মিনিটে নিউ জার্সির নিউইয়র্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৩৩ যাত্রী, ৭ ক্রু ও ৪ ছিনতাইকারী নিয়ে ওড়ে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩।

এই চতুর্থ উড়োজাহাজটির লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবন, কিন্তু যাত্রী ও ক্রুরা সাহস দেখিয়ে ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করায় তা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি; সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি ফাঁকা মাঠে সেটি বিধ্বস্ত হয়। মাঝ আকাশে এই ভয়াবহতার মাঝে সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে ধসে পড়ে সাউথ টাওয়ার এবং সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে ধসে পড়ে নর্থ টাওয়ার। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার চত্বরে শুধু জোড়া টাওয়ারই নয়, ধ্বংস হয়েছিল আরও পাঁচটি ভবন। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজ চলে মাসের পর মাস এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বশেষ স্টিলের টুকরো সরানো হয় ২০০২ সালের ৩০ মে।

এসব হামলায় বিশ্বের ৯০টি দেশের মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭৫৩ জন প্রাণ হারান নিউইয়র্কে, পেন্টাগনে ১৮৪ জন এবং পেনসিলভানিয়ায় ৪০ জন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার তখন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো এবং টুইন টাওয়ার ছিল শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন। হামলার সময় এ ভবন কমপ্লেক্সে ১৬ হাজার ৪০০ থেকে ১৮ হাজার মানুষ অবস্থান করছিলেন বলে মনে করা হয়।

নর্থ টাওয়ারে হামলায় কেউ বাঁচতে না পারলেও সাউথ টাওয়ারের ওপরের তলা থেকে ১৮ জন বেঁচে যান। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানি হামলায় প্রায় ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর, ৯/১১-ই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এর আগেও ১৯৯৩ সালে হামলার শিকার হয়েছিল, যখন ভবনের নিচে একটি ভ্যানে বোমা বিস্ফোরণে ছয়জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। ৯/১১ হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৯ হামলাকারীও। আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ যায় ৩৪৩ ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও ৬০ পুলিশ সদস্যের। ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধুলার কারণে বহু মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যানসার ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি অসুখে আক্রান্ত হন। নিউইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাউন্ড জিরোতে কাজ করা প্রায় ১০ হাজার ফার্স্ট রেসপন্ডার পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন।

এ ভয়াবহ হামলার নেপথ্যে ছিল চরমপন্থী সংগঠন আল-কায়েদা, যার জন্ম ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে তৎকালীন সোভিয়েত বাহিনীর আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে। হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন মার্কিন নাগরিক বা গ্রিন কার্ডধারী, যা তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে প্রবেশ ও ফ্লাইট প্রশিক্ষণ স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ করে দেয়। মনে করা হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও আগ্রাসী ইসরায়েলকে দিয়ে চলা অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল এসব হামলার মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে পরিকল্পনাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নেন এবং লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেন। তারা এতটাই নিখুঁতভাবে মার্কিন সমাজে মিশে গিয়েছিলেন যে স্থানীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কর্মীরাও কিছু সন্দেহ করেননি। ঘটনার দিন হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র ও বক্স-কাটার ব্যবহার করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। প্রতিটি উড়োজাহাজ দূরপাল্লার যাত্রার জন্য পূর্ণ জ্বালানি নিয়ে উড়ছিল বলে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড ছিল আরও ভয়াবহ। উড়োজাহাজের নিরাপত্তাব্যবস্থায় থাকা ফাঁকফোকর, সীমিত স্ক্যানিং; সুবিধা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়ে দুর্বলতা; এসবই হামলাকারীদের সুযোগ করে দিয়েছিল।

হামলার ঠিক পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে নতুন সংকট। বহু মসজিদে আগুন দেওয়া হয় বা ভাঙচুর করা হয় এবং মুসলিমদের ওপর নেমে আসে হত্যার হুমকি ও হয়রানি। ২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শুধু মুসলিম বলে মনে হওয়ার কারণেই অনেককে মারধর, আক্রমণ এমনকি বন্দুকের মুখে ফেলা হয়েছিল। মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ৯/১১ ও এর পরবর্তী বৈষম্য নিয়ে এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিসেবে তাঁরাও সেদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং এ দেশ, এ কমিউনিটি তাঁদেরও। হামলায় মুসলিম ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ বহু মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এফবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বেড়ে যায় প্রায় ১৬১৭ শতাংশ, যা ২০০০ সালে ২৮টি থেকে একলাফে বেড়ে ২০০১ সালে ৪৮১টিতে দাঁড়ায়। হামলার ছয় দিন পর ২০০১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ওয়াশিংটনের ইসলামিক সেন্টারে গিয়ে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “সন্ত্রাস ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নয়। ইসলাম মানে শান্তি, আর সন্ত্রাসীরা শান্তির প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা প্রতিনিধিত্ব করে অশুভ শক্তি ও যুদ্ধের।”

সে সময়ের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯ শতাংশ মানুষ মুসলিম মার্কিনদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন, যদিও ৪০ শতাংশ মানুষ মনে করতেন হামলাকারীরা অন্তত আংশিকভাবে ধর্মীয় কারণেই এ হামলা চালিয়েছিলেন। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক স্যালি হাওয়েল বলেন, “৯/১১–পরবর্তী সময়ে মুসলিম ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই ভয় তৈরি হয়েছিল যে সন্ত্রাস মোকাবিলার নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারি, হয়রানি ও ফাঁদে ফেলার মতো নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়।”

বার্কলের ইসলামোফোবিয়া রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রকল্পের প্রধান হাতেম বাজিয়ান জানান, তাঁদের এক জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিম হিসেবে বসবাস করা অবস্থায় তাঁরা নিজেদের পরিবার ও সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে অন্তত কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন থাকেন। প্রতিটি নির্বাচনী মৌসুমে ইসলামভীতি ক্রমেই একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ ও গণমাধ্যম ভাষ্যকার মুসলিম এবং আরব মার্কিনদের নিয়ে ভয় উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। খ্রিষ্টান হওয়া সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিরুদ্ধে দুই মেয়াদেই মিথ্যা দাবি করা হয়েছিল যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ না করায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যই নন অথবা তিনি গোপনে ইসলাম ধর্ম পালন করেন। হাতেম বাজিয়ানের ভাষায়, ওবামাকে গোপন মুসলিম হিসেবে তুলে ধরে ইসলামভীতিকে ভোটের বাক্সে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

২০১৬ সালের নির্বাচনী মৌসুমে ইসলামভীতিজনিত ঘৃণামূলক অপরাধ আবার বেড়ে গিয়ে ৩০৭টিতে পৌঁছায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের প্রথম দফার নির্বাচনী প্রচারজুড়ে মুসলিমদের সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানান এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প এবিসি নিউজে ভিত্তিহীন দাবি করেন, “নিউ জের্সিতে আরব অধ্যুষিত এলাকার লোকজন টুইন টাওয়ার ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে উল্লাস করছিলেন।” ২০১৬ সালের মার্চে সিএনএনে তিনি আবার দাবি করেন, “ইসলাম ধর্মের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একধরনের ঘৃণা লুকিয়ে আছে।” ক্ষমতায় বসার পর ট্রাম্প একাধিক মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ থেকে অভিবাসীদের প্রবেশে বিতর্কিত ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’ জারি করেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিষেধাজ্ঞাটি বাতিল করার আগপর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধার মুখে পড়েন। তবে অধিকারকর্মীরা মনে করেন, এ আদেশ মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও ভয়কে বৈধতা দিয়েছিল।

এত প্রতিকূলতার পরও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সালে প্রথম মুসলিম হিসেবে কংগ্রেসে নির্বাচিত হন কিথ এলিসন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচিত হন ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব। রশিদা তালিব এবিসি নিউজকে বলেছিলেন, তাঁর মুসলিম পরিচয় ও পটভূমি তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে ইসলামভীতি ও জেনোফোবিয়া থেকে কী ক্ষতি হতে পারে; শুধু ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে নিশানা করলে দেশ আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে এবং তা ঘৃণা ও বর্ণবাদকেই আরও উসকে দেয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে এবং মসজিদের সংখ্যা ২০০০ সালের ১,২০৯টি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ২,৭৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে। স্যালি হাওয়েল উল্লেখ করেন, মুসলিমরা যখন তাঁদের প্রতিষ্ঠান, নাম, হিজাব বা হালাল সাইনবোর্ডের মাধ্যমে অমুসলিমদের কাছে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন, তখনই অজানা ভয় কাটতে শুরু করে।

অন্যদিকে, মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন সম্প্রতি দাবি করেছেন যে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ৯/১১ হামলা সংঘটিত হওয়ার আগেই এ সম্পর্কে জানত। পিয়ার্স মরগানের ‘আনসেন্সরড নিউজ’-এ কার্লসন বলেন, ইসরায়েলের নেতৃত্ব কখনোই ৯/১১ হামলা নিয়ে তাদের মনোভাব লুকায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, হামলার পরপরই ইসরায়েলি নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, “এ ঘটনা আসলে ভালো। কারণ, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।” কার্লসন বহুল আলোচিত ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’ ইস্যু সামনে এনে দাবি করেন, ওই শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী তাঁদের কয়েকজন হামলার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন ও হামলার বিষয়ে আগে থেকেই ধারণা রাখতেন। ২০০১ সালের শুরু থেকে হামলার পর পর্যন্ত অন্তত ২০০ জন ইসরায়েলি নাগরিককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছিল।

৯/১১-এর পরপরই জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এনডিউরিং ফ্রিডম’ শুরু হয় এবং ২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ থাকার অজুহাতে ইরাকেও যুদ্ধ শুরু করে মার্কিন বাহিনী। চালু করা হয় প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট। তবে দীর্ঘ ২০ বছর পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করলে ২০২১ সালে তালেবান আবারও সেখানে ক্ষমতায় ফিরে আসে। নিউইয়র্ক সিটির অবকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে যায় ৬০ বিলিয়ন ডলার, ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতেই ব্যয় হয় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে ৭ বিলিয়নের বেশি অর্থ বিতরণ করা হয়। হামলার পরের তিন মাসেই নিউইয়র্ক হারিয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার চাকরি। অবশেষে ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিল বাহিনীর অভিযানে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন নিহত হন।

দুটি টাওয়ার ধসে পড়তে সময় লেগেছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু তার রেশ বয়ে বেড়াচ্ছে পুরো একটি প্রজন্ম। এ হামলা প্রমাণ করেছে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় শুধু বোমা-বন্দুক যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। অথচ এ হামলার পর থেকে কোটি কোটি নিরপরাধ মুসলিমকে সন্দেহ ও ইসলামভীতি বহনের এক অদৃশ্য বোঝা বইতে হচ্ছে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া থেকে শুরু করে আজকের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ পর্যালোচনা করলে শেষ পর্যন্ত এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিই সামনে চলে আসে; ইসলামভীতি ও অনন্ত যুদ্ধের রাজনৈতিক ফাঁদ তৈরি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি শেষ পর্যন্ত নিজের পাতা ফাঁদেই নিজে আটকে পড়ল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights