ফুঁসে উঠছে পদ্মা পানিবন্দি বহু মানুষ ভাঙনের শঙ্কা

প্রতিদিন ডেস্ক

উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পদ্মা ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ব্লক সরে পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকায় ভাঙনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর অঞ্চলে পদ্মা তীরবর্তী প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জেও অন্তত ১১০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাজশাহী : কয়েক দিন আগেও জায়গাটি ছিল মানুষের আনাগোনায় মুখর। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কেউ কেউ জায়গাটিকে বলছিলেন রাজশাহীর ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’। সেই চর এখন থইথই পানিতে ডুবে আছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরে চলে গেছেন অধিকাংশ বাসিন্দা। গবাদি পশু, ধান, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন তারা। এর মধ্যেই পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকায় নদীতীর ভাঙনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীতীর রক্ষায় বসানো ব্লকের কিছু অংশ সরে গিয়ে কোথাও কোথাও নিচের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। এতে নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিন পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পদ্মা নদীসংলগ্ন বেড়পাড়া এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ সময় হরিপুরের বেড়পাড়া এলাকার নদীতীরে বাড়ি বেগম জাহান আতঙ্কিতভাবে বলেন, ‘পদ্মার পানি আর একধাপ বাড়লেই আমার বাড়ি পানির নিচে চলে যাবে। চোখের সামনে নদীর ব্লক সরে যেতে দেখে প্রতিদিনই ভয় বাড়ছে। আমার বাড়িটি এখন চরম ঝুঁকিতে, কখন কী হয় সেই আতঙ্কে আছি। দ্রুত নদীতীর রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ একই এলাকার বাসিন্দা আবেদ আলী বলেন, ‘পদ্মার পানি বেড়ে তীরে চাপ পড়েছে, শুরু হয়েছে ভাঙন। নদী রক্ষার জন্য বসানো ব্লকও সরে যাচ্ছে, তাই আমাদের ভয় আরও বেড়ে গেছে। কখন যে ভাঙন বাড়তে বাড়তে বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই চিন্তায় আমরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের বাড়িঘর ও জীবনজীবিকা রক্ষার দাবি জানাচ্ছি।’ তবে শুধু বেড়পাড়া নয়, পদ্মার পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নদীর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনেও। পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর খিদিরপুরের ‘মিডিল চরে’ অধিকাংশ বাড়িঘর এখন পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও বাড়ির উঠান ডুবে গেছে, কোথাও আবার চারপাশে পানি। রান্নার সুযোগও নেই অনেক পরিবারের। এর সঙ্গে রয়েছে সাপের আতঙ্ক। চরের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশের জীবিকার প্রধান অবলম্বন গবাদি পশু। তাই ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হলেও গবাদি পশু ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। নৌকায় গাদাগাদি করে গরু নিয়ে শহরের দিকে আসছেন তারা। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়ছে। আগামী এক থেকে দুই দিন পানি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আপাতত বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই।

কুষ্টিয়া : পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ পথ, পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। বসতবাড়ির কাছাকাছি পানি পৌঁছে যাওয়ায় গবাদি পশু, গো-খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ১৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা ঢলের কারণে এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১২ দশমিক ৮৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল সকাল ৯টায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ০২ মিটারে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ ঘণ্টায় ওই পয়েন্টে পানির উচ্চতা বেড়েছে প্রায় ১৪ সেন্টিমিটার। আর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩ দশমিক ৮০ মিটার। সকাল ৯টার হিসাব অনুযায়ী, সেখানে পদ্মার পানি বিপৎসীমার মাত্র ৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুতই পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ : ঢলের পানিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও পানি ঢুকে পড়েছে বসতবাড়িতে। বর্তমানে ১১০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবে যাওয়া ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পানিতে তলিয়ে গেছে আমবাগানসহ ফসলের মাঠ।

এতে দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। স্থানীয়রা জানান, পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। এরই মধ্যে পাকা ইউনিয়নসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার অন্তত ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি দ্রুত কমে না এলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights