অর্থ পাচার বন্ধ হবে কবে
শাহেদ আলী ইরশাদ
দেশ থেকে নানা উপায়ে অর্থ পাচার কোনোভাবেই থামছে না। দেশের অর্থ বিদেশে গিয়ে বাড়ি, গাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক সম্পদে রূপ নিচ্ছে। এসব অর্থ অবৈধ পথে বাইরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশে সঞ্চয় ও উদ্যোক্তার অর্থ থাকলেও নতুন কারখানা, ব্যবসা, আবাসন, বিপণিবিতান কিংবা অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের গতি কমছে। এজন্য অর্থ পাচার ঠেকাতে একদিকে যেমন অবৈধ অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা জরুরি, অন্যদিকে দেশে বৈধ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ, লাভজনক ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাপকহারে অর্থ পাচারের যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তা অব্যাহত ছিল। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে অর্থ পাচারের প্রবণতা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর ও সিআইডি। এসব সংস্থার দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিদ্যমান অসহযোগিতামূলক সম্পর্কের স্থলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে অর্থ পাচার রোধে সরকারের এসব সংস্থার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জাতীয় অর্থ পাচার ঝুঁকি মূল্যায়ন কর্মশালা করেছে। তার আগে ১৩ মে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ যৌথ কর্মশালা করেছে। ৮-৯ মে ক্যামলকো সম্মেলন করেছে বিএফআইইউ। ফলে অর্থ পাচার কমানোর পাশাপাশি সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ঝুঁকি মূল্যায়ন, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের সক্ষমতা এবং আর্থিক খাতের নজরদারি জোরদারে কাজ করছে।
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩-২০২২ সময়ে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮৩০ কোটি ডলার, অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি আনুমানিক ৮৩,৮০০ কোটি টাকা বছরে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র কমিটি ২০০৯-২০২৩ সময়ের অর্থ পাচার বিশ্লেষণ করে মোট প্রায় ২৩,৪০০ কোটি ডলার পাচারের কথা জানিয়েছে। তাদের হিসাবে বার্ষিক গড় পাচার প্রায় ১৬০০ কোটি ডলার ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বছর শেষে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এসব অর্থ ১৮টি দেশে ছড়িয়েছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্ট বেড়ে ৩০,১৯৯টিতে দাঁড়িয়েছে-এক বছরে বৃদ্ধি ৭৪ শতাংশ। বিএফআইইউ বলছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রক নজরদারি, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণ বেড়েছে। এদিকে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিক ও বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর নামে মোট ৮৩৪.২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় এটি আনুমানিক ১২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। এক বছরে অর্থের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরের পর অর্থ এটি সর্বনিম্ন। দেশে বিনিয়োগ না করে অর্থ নিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার শনাক্তে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটি কাস্টমস, কর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ব্যাংকিং খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকি শনাক্তকরণ বাড়াতে একটি আন্তসংস্থা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের অনুমোদিত বিদেশে বিনিয়োগের তথ্য ব্যক্তিগতভাবে বিদেশে কেনা বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, সেকেন্ড হোম বা বিদেশি ব্যাংক হিসাবে ব্যক্তিগত সম্পদের বাইরে। ফলে পরিসংখ্যানের তুলনায় বিদেশে বাংলাদেশিদের মোট সম্পদের পরিমাণ হাজার গুণ বেশি।
কারণ পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখিয়ে ওভার ইনভয়েসিং; প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দেখিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং; ভুয়া আমদানি বা রপ্তানি; একই পণ্যের মূল্য বা পরিমাণ নিয়ে মিথ্যা তথ্য; একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ ঘুরিয়ে দেওয়া; হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। চলতি বছরের ৯ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতে অর্থ পাচার ও মূলধন পাচার ঠেকাতে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ পাচার প্রতিরোধের আইনি কাঠামো হালনাগাদ করা হবে। এর মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনও রয়েছে। প্রকৃত মালিকানার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুসহ আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএফআইইউর এক কর্মকর্তা জানান, সাইপ্রাস, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, জার্সি, গার্নসি, আইল অব ম্যান এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো দেশ ও অফশোর এখতিয়ারেও অর্থের গতিপথের তথ্য পাওয়া গেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অর্থ পাচারের অন্যতম মাধ্যম কর ফাঁকি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চালান জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে এবং এজন্য এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যোগসাজশের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস)-এ অবিলম্বে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে দেশি-বিদেশি সব লেনদেনের তথ্য এনবিআর ও বিএফআইইউর মতো কর্তৃপক্ষের অবিচ্ছেদ্য নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি আশ্রয়ে অর্থ পাচার রোধে বেনিফিসিয়াল ও উনারশিপ স্বচ্ছতা আইন প্রণয়ন করে বেনামি কোম্পানির চূড়ান্ত মালিকানার রেজিস্টার উন্মুক্ত করতে হবে। দুদক, বিএফআইইউ, এনবিআর ও সিআইডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের মধ্যে বিদ্যমান অসহযোগিতামূলক সম্পর্কের স্থলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধির কার্যকর উদে?্যাগ নিতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, অর্থ পাচার বন্ধের পাশাপাশি দেশের ভিতরে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ানো না গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। উদ্যোক্তার কাছে দেশে অর্থ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত তখনই আকর্ষণীয় হবে, যখন তিনি মনে করবেন এখানে সম্পদ নিরাপদ, ব্যবসার নিয়ম স্থিতিশীল এবং মুনাফার পূর্বাভাস তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য। তিনি আরও বলেন, এজন্য কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিনিয়োগ অনুমোদনের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, কর ও শিল্পনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, শিল্পের জন্য জমি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস নিশ্চিত করা, পরিবহন ও বন্দরসেবা সহজ করা এবং ব্যাংক ঋণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও ডিরেগুলেশন, দীর্ঘমেয়াদি কর-স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত খাতে প্রণোদনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ঘোষিত সংস্কারের মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার বন্ধের লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযান বা ব্যাংক হিসাব নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বাণিজ্যিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ, কাস্টমস ও কর তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্যের সমন্বয়, প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত, বিদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং দ্রুত সম্পদ ফ্রিজের পাশাপাশি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত করতে হবে।
দেশে যদি উদ্যোক্তা নিরাপদে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন, নীতির ধারাবাহিকতা পান, ব্যবসার অনুমোদন ও অর্থায়ন সহজ হয় এবং ন্যায্য মুনাফার পূর্বানুমান করা সম্ভব হয়, তাহলে দেশীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ফেরানোর সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে নেওয়ার পথ যত বেশি ব্যয়বহুল, কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ করা যাবে, ততই অর্থনীতির ভিতরে সম্পদ ধরে রাখার প্রণোদনা তৈরি হবে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলেছেন, সঠিক তথ্য, স্থিতিশীল নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ-এই চারটির সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তার অর্থ দেশে থাকবে, নাকি বিদেশে সুযোগ খুঁজবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে শিল্প খাতের যোগাযোগের ঘাটতি ব্যবসায়িক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় আছেন।
