ধুঁকতে থাকা জার্মানির অর্থনীতিকে চাঙা করতে ফিরছে রুশ গ্যাস, কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জার্মানির স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙা করতে এবং ইউরোপের বৃহত্তম এই দেশে আবারও রুশ গ্যাস সরবরাহ চালুর লক্ষ্যে পর্দার আড়ালে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ অর্থনৈতিক দূত এবং জার্মানির প্রভাব বিস্তারকারী অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব আগামী বছরের শুরুতেই এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সংবেদনশীল এই পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুই নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের মার্চ মাসেই হতে পারে এই বহুল আলোচিত বৈঠক। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর জোটবদ্ধ প্রতিরোধের কারণে বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকলেও, জনমত জরিপ অনুযায়ী এই মুহূর্তে জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল এএফডি। আর তাদের সঙ্গে ক্রেমলিনের এমন সখ্যতা ও গোপন বৈঠকের উদ্যোগ জার্মানি তথা পুরো ইউরোপীয় রাজনীতির অন্দরে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

পরিকল্পিত এই হাইভোল্টেজ বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে রুশ প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং দেশটির সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিভের। অপরদিকে, জার্মানির অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল এএফডির দুই সহ-সভাপতি অ্যালিস উইডেল ও টিনো ক্রুপাল্লা বৈঠকে নিজ দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে এএফডির মুখপাত্র কিংবা দিমিত্রিভের প্রতিনিধি—উভয়পক্ষই কোনো ধরনের মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আগপর্যন্ত জার্মানি তাদের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশের বেশি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করত রাশিয়া থেকেই।

পরিকল্পনাকারীদের মতে, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যদি প্রথমে কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি বা ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়িত হয়, কেবল তবেই এই শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। উদ্যোক্তারা আশা করছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা রাশিয়া, জার্মানির এএফডি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একই টেবিলে নিয়ে আসতে পারবেন। মেগা এই বৈঠকের সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত অথবা ভারতের নাম বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর আগে, গত জুন মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এএফডি নেত্রী অ্যালিস উইডেল জার্মানির ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে রুশ তেল ও গ্যাস বয়কট নীতি অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে, চলতি মাসেই মস্কোতে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন পুতিনের দূত দিমিত্রিভ। উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, উইটকফ এবং কুশনারও গ্যাস পুনর্নির্মাণ সংক্রান্ত এই বৈঠকে অংশ নেবেন, যেখানে মূলত রাশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত ‘নর্ড স্ট্রিম’ গ্যাস পাইপলাইন পুনরায় চালু করার বিষয়টি গভীরভাবে পরীক্ষা করা হবে।

যদিও মার্কিন সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, উইটকফ কিংবা কুশনার কাউকেই এমন প্রস্তাবিত সম্মেলনের বিষয়ে এখনো অবহিত করা হয়নি বা কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও এএফডির পক্ষ থেকে এই ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণকে জার্মানির বর্তমান ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থারই প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির মূলধারার ঐতিহ্যবাহী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অতি-ডানপন্থীদের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসলেও, নির্বাচনে এএফডির ক্রমাগত অভাবনীয় সাফল্য সেই প্রতিরোধকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

সম্প্রতি জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট অঙ্গরাজ্য নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এএফডি। এরপরই তাদের জনপ্রিয়তার আরেক কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে মেকলেনবার্গ-ওয়েস্টার্ন পমেরেনিয়া অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে এই অঙ্গরাজ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিতর্কিত রুশ নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনটি এই রাজ্যের ভূখণ্ড দিয়েই জার্মানিতে প্রবেশ করেছে।

মস্কোস্থ আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (আমচ্যাম) এই সম্ভাব্য উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। আমচ্যাম রাশিয়া-র প্রেসিডেন্ট রবার্ট অ্যাজি মন্তব্য করেছেন যে, ইউরোপের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে জার্মানিকে এমন সংলাপে সম্পৃক্ত করা হলে তা দুই দেশসহ পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনার একটি বিস্তৃত প্লাটফর্ম তৈরি করবে। বস্তুত, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সমুদ্র তলদেশের নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ও ক্ষতির পর গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে যে চরম অর্থনৈতিক ধাক্কা আসে, জার্মানি এখনো তা থেকে পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে রাশিয়া থেকে পুনরায় গ্যাস আনা বা নর্ড স্ট্রিম সচল করার যেকোনো প্রচেষ্টা জার্মানির ভেতরে তো বটেই, আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের মিত্রদেশগুলোর তীব্র বাধার মুখে পড়বে।

রাশিয়া থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৃষ্ট জ্বালানিসংকটে তৎকালীন দায়িত্বে থাকা জার্মান জ্বালানিনীতির প্রধান ও বর্তমান গ্রিন পার্টির আইনপ্রণেতা মাইকেল কেলনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, জার্মানি কোনোভাবেই আর রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। জ্বালানিসংকটের মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি দেশটিকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরো খেসারত দিতে বাধ্য করেছিল। আবারও সেই আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়াকে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে অভিহিত করে তিনি অভিযোগ করেন, পুতিন এএফডিকে মূলত তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন।

একই সুরে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্জের নেতৃত্বাধীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটসের পার্লামেন্ট সদস্য রোডরিখ কিসওয়েটার সতর্ক করে বলেছেন, এএফডির এই বৈঠক তার নিজ দলের ভেতরে থাকা রুশ গ্যাস ক্রয়ের সমর্থকদের আরও উৎসাহিত করতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, এএফডি রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে জার্মানি ও ইউক্রেন উভয়ের সঙ্গেই প্রতারণা করছে। রাশিয়া জ্বালানি ও নর্ড স্ট্রিমকে হাইব্রিড সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে; ফলে নর্ড স্ট্রিম পুনরায় চালু করা হলে ইউরোপীয় নিরাপত্তার ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসবে এবং জার্মানি বিশ্বমঞ্চে একা হয়ে পড়বে।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের বিপরীতে এএফডি পুতিনের দেশের সঙ্গে এই ধরনের আলোচনাকে সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে। দলটির নেত্রী উইডেলের ভাষায়, রাশিয়া থেকে পাওয়া নামমাত্র মূল্যের সস্তা জ্বালানিই ছিল ‘মেড ইন জার্মানি’ ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি ও গোপন রহস্য।

সূত্রের খবর, এএফডি নেতারা আশা করছেন যে এই আলোচনার মাধ্যমে তারা দেশের জনগণকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার সক্ষমতা দেখাতে পারবেন এবং লাগামহীন উচ্চ জ্বালানিমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য বর্তমান জার্মানি সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সক্ষম হবেন। জার্মানিজুড়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে মার্কিন ও রুশপন্থী জনমত ক্রমেই মেরুকৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বার্লিন প্রাচীর পতনের পূর্বে দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর সোভিয়েত শাসনের অধীনে থাকা পূর্ব জার্মানির বাসিন্দারা রাশিয়ার প্রতি ঐতিহাসিকভাবে কিছুটা সহানুভূতিশীল এবং আমেরিকার সামরিক প্রভাবের প্রতি চরম সমালোচনামূলক মনোভাব পোষণ করেন।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights