দুপুর হলেই বন্ধ ল্যাবরেটরি

জয়শ্রী ভাদুড়ী
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের জন্য আছে শত শত কোটি টাকার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। কিন্তু দিনের বড় একটি সময়ই এসব যন্ত্র পড়ে থাকে অব্যবহৃত অবস্থায়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রোগীদের পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ মিললেও এরপর অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের ল্যাবরেটরি সেবা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বিকালের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে রোগীদের ছুটতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে একদিকে বাড়ছে রোগীর চিকিৎসাব্যয়, অন্যদিকে গুরুতর অসুস্থ রোগীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের বিদ্যমান অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিকাল ও রাতের শিফট চালু করা গেলে বিপুলসংখ্যক রোগী কম খরচে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ পেতেন।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে বিকাল ৪টায় দেখা গেছে রোগীর ভিড় থাকা সত্ত্বেও একের পর এক নতুন রোগী আসছিলেন। তাঁদের মধ্যে জরুরি বিভাগে আসা অনেক রোগীরই প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার। কিন্তু হাসপাতালের ল্যাবরেটরি দুপুর ১টার পর বন্ধ থাকায় তাদের পরীক্ষা করাতে যেতে হচ্ছিল বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। শুধু উপজেলা পর্যায়েই নয়, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র। রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, হুইলচেয়ারে করে হাসপাতালের বাইরে নেওয়া হচ্ছিল হৃদরোগে আক্রান্ত মাহফুজুল হক নামে এক রোগীকে। চিকিৎসক তাকে ইকোকার্ডিওগ্রাম করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু বিকালে হাসপাতালের ভিতরে সেই পরীক্ষা করানোর সুযোগ না থাকায় তাকে নিয়ে যেতে হচ্ছিল বাইরে। আবার বিকালের দিকে হাসপাতালের প্রবেশমুখে দেখা গেছে, রোগীদের একের পর এক বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য। কেউ পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, কেউ হুইলচেয়ারে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নেওয়া হচ্ছিল স্ট্রেচারে করে। হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর সুযোগ না পেয়ে তাদেরকে যেতে হচ্ছিল বেসরকারি হাসপাতালে।

সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কমবেশি এই একই চিত্র। দুপুর ১টার পর পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য টাকা জমা নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগীদের নির্ভর করতে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর। এতে বাড়ে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি। অভিযোগ রয়েছে, রোগীদের এই অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্র। অবশ্য কিছু সরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর জন্য বিকালে সীমিত পরিসরে কয়েকটি পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বহির্বিভাগের রোগীদের বড় অংশকেই বিকালের পর বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিকালেও ল্যাবরেটরি চালু রাখার বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তা করছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ চলছে।’

সরকারিভাবে রোগনির্ণয়ের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার। সকালে যেখানে রোগীদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না, দুপুরের পর সেখানে দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন চিত্র। বিকালে ল্যাবরেটরি সেবা চালুর উদ্যোগের কথা থাকলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিকাল ও রাতের শিফট চালুর অন্যতম বড় বাধা জনবলসংকট। যন্ত্রপাতি থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, নার্স ও অন্যান্য কর্মী না থাকায় দীর্ঘ সময় ল্যাব চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশীদ বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক যন্ত্রপাতি রয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করে ফেলে রাখার ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগেরও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। বিকালের শিফট চালু করা গেলে রোগীরা সরকারি ব্যবস্থায় কম খরচে পরীক্ষা করানোর সুযোগ পাবেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করে সেবার পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে চিন্তা করা উচিত।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, দেশে সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামোর সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে ছয় শতাধিক হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের রোগনির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রোগীদের পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধ হয়ে যায় বহির্বিভাগের পরীক্ষার কার্যক্রম। ফলে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ দিনের প্রায় ১৯ ঘণ্টাই অব্যবহৃত অবস্থায় থাকে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে দিন-রাত বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকায় রোগীরা বাধ্য হয়ে সেদিকেই ছোটেন। সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো পুরো সময় কাজে লাগানো গেলে রোগীদের ওপর আর্থিক চাপও কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে সরকারি ব্যবস্থায় বিকাল ও রাতের শিফট চালুর একটি উদাহরণ রয়েছে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। রোগীদের প্রয়োজন বিবেচনায় সেখানে বিকাল ও রাতের শিফটে পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও ধাপে ধাপে এ ধরনের সেবা চালু করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি হাসপাতালের বিদ্যমান ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতিকে সর্বোচ্চ সময় কাজে লাগানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা গেলে একই অবকাঠামো দিয়ে আরও বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর রোগীদের নির্ভরতা কমবে, কমবে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights