সংকটে পোশাক রপ্তানি

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার ‘বাব আল মান্দেব’ প্রণালির চলমান সংকটের ধাক্কা লেগেছে দেশের তৈরি পোশাক খাতে। লোহিত সাগরের উপকূলে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। রুট পরিবর্তন করার ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং সময় দুটিই বেড়েছে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের। এতে বাড়তি চাপ পড়েছে রপ্তানিকারকদের মধ্যে। তৈরি হয়েছে শঙ্কা। লজিস্টিকস ও শিপিং বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব ভালোভাবেই পড়েছে দেশের আমদানি-রপ্তানিতে। বিশেষ করে বাব আল মান্দেব প্রণালির সংকটে ইউরোপ-আমেরিকায় আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। যার প্রভাবে ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি ব্যয় বহুলাংশ বেড়েছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক খাতে।

বিজিএমইএর পরিচালক ও এশিয়ান গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য ‘বাব আল মান্দেব’ প্রণালি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রণালি দিয়েই ইউরোপ আমেরিকার সিংহভাগ তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। অন্য রুট ব্যবহার করলে সময় এবং খরচ দুটিই বাড়বে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পণ্য পরিবহনের খরচ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এ প্রণালির সংকট এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে। পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হলে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে ক্রেতা হারাতে পারেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা।

জানা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক মূলত বাব-আল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ এবং আমেরিকার পূর্ব উপকূলের বাজারগুলোতে রপ্তানি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ- জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই এ সংক্ষিপ্ত ও সাশ্রয়ী রুট ব্যবহার করে। লোহিত সাগর উপকূলে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে রুটটি ঝুঁঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা মহাদেশের ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব বেড়ে গেছে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। আফ্রিকা ঘুরে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পৌঁছাতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের (লিড টাইম) চেয়ে অতিরিক্ত ১২ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত বেশি সময় লাগছে। জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় কনটেইনারের আসা-যাওয়ার চক্র দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে খালি কনটেইনার ও ফিডার ভেসেলের তীব্র শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে পোশাক ক্রেতাদের স্টোরে পৌঁছাতে না পারায় ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করার বা বড় অঙ্কের ডিসকাউন্ট চাওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের কাছে। ক্ষেত্রবিশেষে ক্রেতার শর্ত মানতে গিয়ে পোশাক রপ্তানিকারকদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেইটে (বিমানে) পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। এতে বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ব্যয়। শুধু পোশাক রপ্তানিই নয়- লোহিত সাগরের সংকটের কারণে ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে আসা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ পরিবহনেও বিলম্ব হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সমুদ্রপথের সঙ্গে জাহাজের বিমা ব্যয় এবং যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়ামও বেড়ে গেছে। ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সামগ্রিক ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। লজিস্টিকস ও শিপিং বিশেষজ্ঞ খায়রুল আলম সুজন বলেন, লোহিত সাগরের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে পারেন রপ্তানিকারকরা। তাই সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা, সময়মতো শিপমেন্ট পরিকল্পনা, ক্রেতাদের সঙ্গে আগাম সমন্বয় এবং বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের বোঝা কীভাবে ভাগ করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights