মুক্তির সংগ্রাম চলছে চলবে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
উন্নতির এক নির্ভরযোগ্য নিরিখ হচ্ছে মেয়েদের অগ্রগতি। মেয়েরা অবশ্যই আগের তুলনায় অনেক এগিয়েছে। বিবরণের প্রয়োজন নেই। অগ্রগতি দৃশ্যমান বটে। কিন্তু ওই যে উন্নতির নিচে সামাজিক অবনতি; সেটি ধরা পড়ে মেয়েদের জীবনে নিরাপত্তার অভাবের চিত্রে। যেমন-ধর্ষণে। এটি আগে যে ছিল না তা নয়, কিন্তু গণধর্ষণের কথা শোনা যেত না। ওই অত্যাচারটি একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা করেছে; কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে মেয়েরা নিজ দেশি দুর্বৃত্তদের হাতে ব্যাপকভাবে লাঞ্ছিত হবে; এটি কারও মনে দুঃস্বপ্নেও ছায়াপাত করেনি। অথচ সেটিই ঘটছে। কেবল গণধর্ষণ নয়, পাকিস্তানি দস্যুরা যা করেনি বাংলাদেশিরা তাই করছে। শিশুধর্ষণ। এবং ধর্ষণের পর শিশুদের হত্যা করা। আমাদের উন্নতির চিত্রের ওপর যে কালোছায়াগুলো বিদ্যমান নারীর নিরাপত্তাহীনতা তার ভিতর সবচেয়ে লজ্জাজনক।
এ নিয়ে এক আলোচনাসভায় কথা হচ্ছিল। এক বন্ধু বললেন, ধর্ষণকারীরা আমাদেরই সন্তান, ভাই, আত্মীয়; কিন্তু তারা অপরাধী ও ব্যাধিগ্রস্ত। কথাটি অবশ্যই সত্য। ধর্ষণের চেয়ে নিকৃষ্ট অপরাধ আর কী-ই বা হতে পারে? এ তো হচ্ছে মাংসাশী পশুর আচরণ। মনুষ্য নামে পরিচিতদের জন্য এ যে এক ধরনের ব্যাধি সেটি অস্বীকার করবে কে?
আমরা অপরাধ ও ব্যাধিমুক্ত সমাজ চাই। কিন্তু তা তো পাচ্ছি না। অপরাধীদের শাস্তি হয় না। কেউ কেউ ধরা পড়ে, তারপর বেরিয়ে এসে আবার অপরাধ শুরু করে দেয়। এ ক্ষেত্রে তো রাষ্ট্র স্বয়ং অপরাধী হয়ে রয়েছে। তার অপরাধ সমাজের কাছে, মানুষকে সে নিরাপত্তা দিতে পারছে না বলে। আসলে সমাজ এবং রাষ্ট্র উভয়েই ব্যাধিগ্রস্ত। যেজন্য অপরাধী ও ব্যাধিগ্রস্ত লোকের সংখ্যা কমে না, বাড়তেই থাকে। কজনকে শাস্তি দেব, কোন কারাগারে তাদের আটক রাখব? কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে রাষ্ট্র ও সমাজের চিকিৎসা চলবে?
ধারণা থেকে বলি, অভিজ্ঞতা থেকেও জানি, গবেষণা করলেও নিশ্চিত হওয়া যাবে যে ব্যাধিটির নাম অপরিণামদর্শী পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের অনেক গুণ আছে, কিন্তু তার ভিতর অপরাধও আছে। সেই অপরাধ অবাধে রাষ্ট্র ও সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধগুলো আমাদের পরিচিত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির ও মুনাফার লোভ, ভোগবাদিতা, প্রতারণা, বেকারত্ব, মানুষে মানুষে বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতা। এসবের দ্বারা আমরা নানাভাবে আক্রান্ত। ধর্ষণের ঘটনাও এর বাইরে নয়।
কিন্তু প্রতিকার কী? ব্যাধি আছে, সেটি সত্য; কিন্তু নিরাময় যে চাই সেটি আরও বড় সত্য। শিক্ষার কথাই প্রথমে মনে আসে। অনেক কাল আগে, সেই পাকিস্তান আমলে এক প্রবীণ দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি জেনে মন্তব্য করেছিলেন সাধারণ মানুষের ধারণা এই যে শিক্ষিত মানুষেরা হচ্ছে ভয়ংকর প্রাণী। কেন? জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন, কারণ মানুষ দেখে যে যারা বড় রকমের প্রতারণা করে তাদের সবাই শিক্ষিত। এদের মধ্যে কে যে চোর আর কে সাধু বলা মুশকিল। তাহলে মানুষ শিক্ষিত হতে চায় কেন, এই প্রশ্ন তোলায় তিনি হেসে বলেছিলেন, অধিকাংশেরই লক্ষ্য প্রতারক হওয়া। পরে ভেবে দেখেছি খুব যে মিথ্যা বলেছিলেন তা নয়। প্রতারণাই যেখানে আদর্শ ও নিয়ম সেখানে প্রতারক না হওয়া মানেই তো পিছিয়ে পড়া। স্বেচ্ছায় পিছিয়ে পড়াটা কারও স্বভাবসিদ্ধ নয়।
না, কেবল শিক্ষায় কুলাবে না। অথবা বলা যায় সেই শিক্ষার দরকার হবে যা সমাজ বদলে সাহায্য করবে। এ শিক্ষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেবে বলে ভরসা করা যাবে না, এর জন্য যেতে হবে বাইরে, অর্থাৎ আন্দোলনে। সমাজবদলের আন্দোলন চাই। তার জন্য চাই জ্ঞান ও সচেতনতা। ওই জ্ঞান ও সচেতনতা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যাবে সমাজবদলের আন্দোলনের ভিতর থেকেই।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অপরিহার্য। কিন্তু তার উদ্দেশ্য হওয়া চাই মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর করা নয়, মানুষকে সামাজিক করা। তার কাজ হবে সমাজে ঐক্য আনা। সে ঐক্য পুঁজিবাদী ব্যাধি ও অপরাধপ্রবণতা দূর করার ক্ষেত্রে উপকারী হবে। কিন্তু শিক্ষাকে যে তিন ধারায় আমরা বিভক্ত করে ফেলেছি তাতে ঐক্য তৈরি হচ্ছে না, বরঞ্চ সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবিভাজন আরও গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে। তার কুফল ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যতে তা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা।
এটি অবশ্যই সর্বজনস্বীকৃত যে যথার্থ শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে, অর্থাৎ সামাজিক করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামাজিক প্রতিষ্ঠানও বৈকি। গৃহে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তার ভিতর যেটুকু ভ্রান্তি থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তা সংশোধন করা। গৃহ বলে, তুমি গৃহী হবে, অর্থাৎ নিজের সুখসুবিধা দেখবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বলার কথা, তুমি একা নও, অনেকের সঙ্গে আছ, এরা সবাই তোমাকে কিছু না কিছু দেবে, তুমিও যে দেবে না তা নয়, এভাবে তুমি সামাজিক মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা পেয়ে যাবে। এই কথাগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বলার কথা নয়, বলার কথা বিশেষভাবে ক্লাসরুমের বাইরেই, বিভিন্ন রকমের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এমনকি খেলাধুলার মধ্য দিয়েও। কিন্তু শিক্ষকরাও তো এই রুগ্ণ সমাজেরই মানুষ। তাঁদের পক্ষে ওই দায়িত্ব পালন সম্ভব কি? সম্ভব যে হচ্ছে না সে তো দেখতেই পাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণের উৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে ছাত্র সংসদের নির্বাচন ও কার্যক্রম। কিন্তু পরিতাপের বিষয় ছাত্র সংসদের কার্যক্রম এখন প্রায় অনুপস্থিত।
সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনটি একাধারে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক। সন্দেহ কী যে এ ক্ষেত্রে তরুণরাই প্রধান ভরসা। প্রতিষ্ঠিত নেতারা এখন আর নেই। যাঁরা ছিলেন তাঁদের ভিতর অনেকেই ক্ষমতা লাভের রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত। তাঁদের কাছ থেকে সমাজ পরিবর্তনের ব্যাপারে তেমন কিছু আশা করার ছিল না। তাঁদের অনুসারীরা যা করছেন তাতে সমাজ বদলাবে এমন আশা বৃথা, তাঁদের কাজে সমাজের কল্যাণ হবে, এরকমের সম্ভাবনা মোটেই নেই। মুক্তির জন্য যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদেরও অনেকে পরলোকগত। যাঁরা আছেন তাঁদের অধিকাংশই ক্ষমতার রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নিজেদের আদর্শবাদকে তো অবশ্যই, অস্তিত্বকেই বিলীন করে দিয়েছেন। তরুণের সামনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এখন বিরল।
কিন্তু মুক্তির জন্য আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তো আছে। সেটি হারিয়ে যায়নি। ইতিহাস ও ঐতিহ্য হিসেবে আছে; মুক্তির চলমান আন্দোলন তাকে ধারণ করে; সে আন্দোলন নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছে। সেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা মূল্যবান উপাদান। আর আছে সচেতনতা। মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা পরিবর্তন চায়; কিন্তু পরিবর্তন আনতে পারবে এমন দল পায় না। যাঁরা আছেন তাঁরা নানাভাবে বিভক্ত; আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই বিভাজন বড় রকমের একটা দুর্বলতা।
চব্বিশের আন্দোলনে যে আশা জেগেছিল, তা-ও হারিয়ে গেল। অবস্থা এবং ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটল না। অর্থাৎ অন্ধকার মুক্ত হতে পারলাম না। তবে এ জাগরণ মানুষকে নাড়া দিয়েছে, আশান্বিত করেছে। তাৎক্ষণিক অর্জন দিয়ে এর মূল্যায়ন করা যাবে না। এর মূল্য নিহিত রয়েছে এটি যে ঘটেছে তার মধ্যেই। বোঝা গেল নানা বিভ্রান্তিতেও তরুণদের ভিতর আদর্শবাদ হারিয়ে যায়নি। এই আদর্শবাদের দুটি দিক; একটি প্রত্যাখ্যান, অপরটি পুনর্ব্যক্তকরণ। তরুণরা মূলধারার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সে রাজনীতির প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতির সব দলই এই জাগরণকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছে এবং সেই চেষ্টার মধ্য দিয়ে নিজেদের ভিতরকার দুর্বলতাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দিয়েছে। প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে এই জাগরণ এটিও জানিয়ে দিয়েছে, তরুণরা ক্ষমতার নয়, মুক্তির রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু তরুণদের একাংশের অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার জন্য পুরো জাগরণকেই নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাদের বৃহদাংশ জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের কলঙ্কিত করেছে।
স্বীকার করতেই হবে, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলনটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সেখানেই একাধারে এর সরলতা ও দুর্বলতা। মুক্তির আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তাকে ধারাবাহিকও হতে হবে। এতে ধারাবাহিকতার সম্ভাবনা ছিল না, এবং সে পথে তা এগোয়নি।
কিন্তু ওই যে হাজার হাজার মানুষ একত্র হলো, যাঁরা পরস্পরকে চেনে না, কিন্তু যাঁদের ভিতর পারস্পরিক নৈকট্য ছিল গভীর, যেজন্য বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি, কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, সেটি সামান্য ব্যাপার নয়। নৈকট্যটি এসেছে লক্ষ্যের অভিন্নতা থেকেই। মুক্তির সংগ্রাম চলছে চলবে, কেননা ওই পথেই এবং কেবল ওই পথেই মুক্তি আসবে বলে ভরসা।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
