আদানির বিদ্যুৎচুক্তি: বাণিজ্যিক স্বার্থ বনাম দেশের সার্বভৌমত্ব
ড. মো. মিজানুর রহমান
বিদ্যুৎ একটি দেশের অর্থনীতির অপরিহার্য চালিকাশক্তি। কিন্তু বিদ্যুতের প্রয়োজন যতই জরুরি হোক, সেই প্রয়োজন মেটাতে এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা যুক্তিসংগত নয়, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আদানি পাওয়ারের ২৫ বছরের বিদ্যুৎচুক্তি তাই এখন শুধু একটি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নয়; এটি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক দায় এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই চুক্তির রাজনৈতিক পটভূমি বুঝতে হলে ২০০৯ সাল থেকে শুরু করতে হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে এবং ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১০ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ইশতেহার এবং পরবর্তী বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি এবং ভারতীয় সরকারি-বেসরকারি উভয় খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদে বিভিন্ন খাতে ভারতের সঙ্গে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা করে, যার অনেকগুলোর শর্ত ও বাস্তব ফলাফল বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে ছিল না।
এই ঘনিষ্ঠতার ধারাবাহিকতায় আদানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি শক্তিশালী জনধারণা তৈরি হয়—আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা পাওয়ার প্রতিদান হিসেবে ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং আদানি চুক্তিও সেই বৃহত্তর সম্পর্কের একটি ফল। বিশেষ করে ২০১৭ সালে কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি হওয়ার পর এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ জনসমক্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে এটিকে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সত্য বলা যাবে না; কিন্তু দেশের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে এটি চুক্তিটির প্রধান রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় পরিণত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে চুক্তির মূল্য, শর্ত ও আর্থিক বোঝা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো এই জনধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
এখানে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার প্রায় ৪৬ বছর অতিক্রম করেছে। দেশ তখন আর সদ্যস্বাধীন বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ছিল না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ছিল, নতুন সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছিল এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছিল। ফলে দেশের সক্ষমতা অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিজস্ব উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা সম্ভব ছিল। সেই অবস্থায় একটি বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে ২৫ বছরের এমন চুক্তি করে জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থায় তাকে এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল দ্রুত বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করা। কিন্তু এই যুক্তিরও একটি সীমা রয়েছে। ২০১০ সালের ‘কুইক এনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট’ মূলত তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রণীত হয়েছিল। প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকায় দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, জরুরি ভিত্তিতে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়ে পরিণত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইনটি বাতিল করা হয়।
২০১৭ সালে সেই নীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয় এবং বাংলাদেশ প্রায় ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে একটি বিদেশি কেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদে এমনভাবে যুক্ত করা হয়, যার উৎপাদনের বড় অংশই বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত।
চুক্তির অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসার পর এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি বিদ্যুতের প্রাথমিক দর ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় শূন্য দশমিক ০৮৬১ ডলার, যা পরবর্তী সময়ে প্রায় শূন্য দশমিক ১৪৯ ডলারে দাঁড়ায়। কমিটির হিসাবে, আদানি চুক্তির মূল্য নিকটতম বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকল্পের তুলনায় প্রায় ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি এবং একটি যৌক্তিক বেঞ্চমার্কের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়াতেও গুরুতর অসঙ্গতি ছিল বলে কমিটি উল্লেখ করেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুৎ বাংলাদেশের গ্রিডে আসার পর মূল্য পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রয়টার্সের হিসাবে, ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানি থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গড়ে ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা দিয়েছে, যেখানে অন্যান্য ভারতীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে গড় মূল্য ছিল ৯ টাকা ৫৭ পয়সা। অর্থাৎ একই দেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের ক্ষেত্রেই আদানির বিদ্যুতের মূল্য ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশের খুচরা বিদ্যুতের গড় মূল্যের তুলনায়ও এটি ছিল উচ্চ। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও জনগণের ওপর পড়ে। চুক্তির অন্যতম ক্ষতিকর শর্ত হলো—বাংলাদেশ বিদ্যুৎ গ্রহণ করুক বা না করুক, আদানিকে বছরে ৪২৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতেই হবে, যা ২৫ বছরে দাঁড়াবে ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
মূল্যের পাশাপাশি ঝুঁকি বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতে, কয়লার মূল্য নির্ধারণের সূত্র, ক্ষমতা-চার্জ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং বিভিন্ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি চাপানো হয়েছে। কয়লার প্রকৃত ক্রয়মূল্যের পরিবর্তে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মূল্যসূচকের ব্যবহার এবং চুক্তির মধ্যে ভারতীয় করের উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও কমিটি প্রশ্ন তুলেছে। অর্থাৎ চুক্তির সমস্যা শুধু ‘কত দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে’—এখানে সীমাবদ্ধ নয়; মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকির কতটা বাংলাদেশ বহন করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে বাংলাদেশ আদানির বিল পরিশোধে পিছিয়ে পড়লে বিরোধ আরও প্রকট হয়। দুই পক্ষের হিসাবে বকেয়ার পরিমাণেও বড় পার্থক্য ছিল। এক পর্যায়ে আদানি সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং বাংলাদেশও পরবর্তী সময়ে কম বিদ্যুৎ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে বোঝা যায়, ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেই সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না; অর্থপ্রদানের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং দুই পক্ষের চুক্তি-ব্যাখ্যাও সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে। পরবর্তী সময়ে বিরোধটি আইনি ও সালিশি পর্যায়েও গড়ায়।
এখানেই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি দায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি বিদ্যুৎচুক্তি যদি প্রতিযোগিতামূলক না হয় বা রাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়, তাহলে পরবর্তী সরকার চাইলেই তা সহজে বাতিল করতে পারে না। চুক্তির সালিশি ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণের সম্ভাবনা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। অর্থাৎ একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু বর্তমান সরকারের নয়; এর আর্থিক দায় বহু বছর ধরে রাষ্ট্রকে বহন করতে হতে পারে।
আদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার মাত্রাটিও তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের ২০২৬ সালের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে গোড্ডা কেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ মিশ্রণের প্রায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করেছে। একটি মাত্র বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর এই মাত্রার নির্ভরতা কৌশলগতভাবে মোটেই তুচ্ছ নয়।
কারণ বিদ্যুৎ অন্য অনেক পণ্যের মতো নয়। কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে একটি নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি কমে গেলে বিকল্প উৎস থেকে তা সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে; কিন্তু জাতীয় গ্রিডে বড় একটি বিদ্যুৎ উৎস হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তার তাৎক্ষণিক বিকল্প তৈরি করা কঠিন। শিল্পকারখানা, রপ্তানি, বাণিজ্য, কৃষি, সেবা এবং সাধারণ মানুষের জীবন এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই একটি বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ-নির্ভরতা অর্থনৈতিক নির্ভরতার পাশাপাশি কৌশলগত দুর্বলতাও সৃষ্টি করতে পারে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি বাংলাদেশের এই বিদ্যুৎনির্ভরতার ঝুঁকিকে বাস্তবভাবে সামনে আনে। গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ১,৪৩০ মেগাওয়াট থেকে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে এবং সীমিত ব্যাকআপের কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। ভারত ও আদানি পাওয়ার অবশ্য এটিকে কারিগরি ত্রুটিজনিত ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের সময়গত নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিদেশি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে তার কারিগরি সমস্যা বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের টানাপোড়েনও বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎনিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গাতেই বিদ্যুৎ বাণিজ্য থেকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি আসে। আধুনিক রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব শুধু ভূখণ্ডের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নয়; সংকটের সময় নিজের অর্থনীতি, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও সার্বভৌমত্বের অংশ। বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি একটি বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়, সেই কোম্পানির সঙ্গে মূল্য, বিল, কর বা চুক্তি নিয়ে বিরোধ থাকে এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের দরকষাকষির ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে যায়। এটাই এই চুক্তির সবচেয়ে গভীর কৌশলগত উদ্বেগ।
তবে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে উপকারী হতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থে প্রয়োজন এমন একটি বিদ্যুৎব্যবস্থা, যেখানে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আসবে, প্রয়োজনে নেপাল ও ভুটান থেকেও আসবে, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা থাকবে এবং পর্যাপ্ত রিজার্ভ সক্ষমতাও থাকবে। একাধিক উৎস থাকলে শুধু সরবরাহ নিরাপদ হয় না, দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়ে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি আদানি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে, নাকি তা সংস্কার করবে? এ ক্ষেত্রে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা। প্রথমে চুক্তিটির স্বাধীন আইনি, আর্থিক ও কারিগরি অডিট করে কয়লার মূল্য, ক্ষমতা-চার্জ, কর, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং বকেয়া অর্থসহ সব শর্তের ন্যায্যতা যাচাই করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকারভিত্তিতে পুনঃআলোচনার মাধ্যমে বিদ্যুতের মূল্য কমানো, অযৌক্তিক চার্জ ও ঝুঁকি হ্রাস এবং চুক্তির শর্তে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা উচিত। তা সম্ভব না হলে চুক্তির আইনি কাঠামোর মধ্যে বাতিল বা ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার পথ বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন, বহুমুখী বিদ্যুৎ আমদানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়িয়ে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎচুক্তি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, স্বাধীন মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়া করা উচিত নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বিদ্যুৎ পাওয়া নয়; ন্যায্য মূল্য, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং সর্বনিম্ন কৌশলগত ঝুঁকি নিশ্চিত করা।
আদানি বিদ্যুৎচুক্তির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বিদ্যুৎ ঘাটতি সাময়িক, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভুল চুক্তির দায় সাময়িক নয়। ২০১৭ সালে যে সিদ্ধান্তকে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহের সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, প্রায় এক দশক পর সেটিই মূল্য, বকেয়া, চুক্তির শর্ত, আইনি বিরোধ এবং জ্বালানি-নির্ভরতার প্রশ্নে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। তাই এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, বিদ্যুৎ বাণিজ্য থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা কোনো বিদেশি কোম্পানি বা রাষ্ট্রের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হবে না যে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সময় রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সার্বভৌমত্বের প্রকৃত অর্থ শেষ পর্যন্ত এখানেই—বিদ্যুৎ চাই বলে বিদ্যুৎ কিনতে হবে, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতি এমন হতে হবে, যাতে শিল্প চলে, অর্থনীতি এগোয়, জনগণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায় এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্র তার জ্বালানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আদানি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন তাই কেবল একটি পুরোনো চুক্তি সংশোধনের কাজ নয়; এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তি কতটা শক্ত হবে, সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরও পরীক্ষা।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।
Mizan12bd@yahoo.com
