বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানে ধীরগতি
ইমরান চৌধুরী
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। তিনি উন্নয়ন অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, আর্থিক খাতের অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির নীতিনির্ধারণেও তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে নীতি গবেষণা ও বিশ্লেষণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সংকটগুলো আরও কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভাঙাচোরা ও সংকটময় অর্থনীতি পেয়েছিল। এই সমস্যাগুলোর বেশির ভাগ বা অর্ধেক ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে গেলেও মধ্য মেয়াদের সময়সীমা লাগবে। অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে সামষ্টিক স্থায়িত্ব ও সময়োপযোগী সংস্কার জরুরি।
সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাসরুর রিয়াজ বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি হলো বিকাশ, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের মূল ভিত্তি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি ক্রমাগত নিম্নমুখী ছিল, তবে এরপর বৈদেশিক মুদ্রার হারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বেড়ে প্রায় ২৭-২৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে যাওয়ার মতো মজবুত ভিত্তি এখনো তৈরি হয়নি। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ শতাংশের নিচে নামলেও তা এখনো ব্যবসা ও মূলধনের খরচের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের মন্থরগতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তৈরি পোশাক খাতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ব্যবহার, দক্ষতার ঘাটতি এবং সামগ্রিক বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল থেকেই নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি ধীর হয়ে গেছে। রপ্তানি খাতের বর্তমান বাধা সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের শেষের দিকে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তুলে ধরে মাসরুর রিয়াজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ আমাদের সমস্যাকে বাড়িয়ে দিলেও মূল জ্বালানি সংকটটি অভ্যন্তরীণভাবে বেশ কয়েক বছর আগেই তৈরি হয়েছিল। ২০১২-১৩ সাল থেকে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান বন্ধ থাকার কারণে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রতিনিয়ত কমছে। সমুদ্র ও স্থলভাগে নতুন অনুসন্ধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর সাড়া এখনো বেশ শ্লথ। আমদানীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থানীয় গ্রিডে যুক্ত করার জন্য আমাদের মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুটি পাইপলাইন প্রকল্প বাতিল করা হলেও সেগুলোর দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করাটা ছিল তাদের একটি বড় দুর্বলতা। যার কারণে বর্তমানে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের গ্যাস সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ঋণমান ও ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়ে তিনি বলেন, দশ বছর আগে আমাদের দেশের আর্থিক ঋণমান ভিয়েতনামের সমান ছিল, অথচ এখন ভিয়েতনাম দুই ধাপ ওপরে উঠেছে আর আমরা দুই ধাপ নিচে নেমে কম্বোডিয়ার সমপর্যায়ে চলে গেছি। এই নেতিবাচক ঋণমান বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নে আস্থার সংকট তৈরি করছে। সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ও অর্থায়ন ব্যবস্থা সম্পর্কে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সাধারণত এ দেশের কোনো সরকার অর্থনৈতিক সংকট প্রকাশ্যে স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু বর্তমান সরকার সমস্যাগুলোকে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে-যা একটি প্রশংসনীয় পরিবর্তন।
