ইলিশ কমছে কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর আগে
জাতীয় মাছ ইলিশ কেবল সুস্বাদু খাবারই নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, এতিহ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবেগের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ, দাম এবং বিশেষ করে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কয়েক শ’ টন ইলিশ দেশে আসলেও গত ১৮ সেপ্টেম্বর মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ভারত থেকে আর কোনো ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ইলিশ আমদানি বন্ধ হলেই কি দেশের ইলিশের সংকট মিটবে?
প্রশ্নটি আসলে আরও গভীর। আমদানি বন্ধ রাখা হবে কি না, সেটি সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর অন্তরালে যে মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, সেটি হলো—বাংলাদেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের বিচরণ ও প্রাপ্তি কমছে কেন? দেশের মানুষ যদি নিজেদের নদী ও জলসীমা থেকে প্রয়োজনীয় ইলিশ না পায়, তাহলে শুধু
আমদানি বন্ধ বা চালু করার সিদ্ধান্ত দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? আবার আমদানি করা মাছকে পদ্মা-মেঘনার ইলিশ বলে বেশি দামে বিক্রি করা হলে সেটিও ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার শামিল। তবে কেবল আমদানির দুয়ার বন্ধ করাই সমাধান নয়, কারণ ইলিশ- রুই, কাতলা বা তেলাপিয়ার মতো সাধারণ পুকুরে চাষযোগ্য কোনো মাছ নয়। এটি একটি শতভাগ প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ, যার জীবনচক্র নদী, মোহনা ও সমুদ্রের জটিল বাস্তসংস্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ এবং জাতীয় জিডিপিতে এর অংশ প্রায় ১ শতাংশ। শুধু তাই নয়, প্রায় ৫ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং পরিবহন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ। সুতরাং ইলিশ কেবল স্বাদের উপাদান নয়, এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি।
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবিবের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মৎস্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ মতামত অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। দেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে কেবল জেলের জালে কী পরিমাণ মাছ উঠছে, তা দেখলে চলবে না। নজর দিতে হবে নদী, মোহনা, প্রজননক্ষেত্র, প্রজাতিটির অভয়াশ্রম এবং সমুদ্র থেকে নদীতে চলাচলের প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথের ওপর। বর্তমানে দেশের নদী ও সমুদ্রে ইলিশের সার্বিক মজুত বা ‘স্টক অ্যাসেসমেন্ট’ কেমন, কত আকারের মাছ কী পরিমাণে আছে এবং প্রজননক্ষম মাছের ঘনত্ব কেমন—এসব বৈজ্ঞানিক তথ্যের নির্ভরযোগ্য উত্তর ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা অসম্ভব।
বিশেষ করে, যেভাবে ইলিশের মোট উৎপাদন ও একক মাছের গড় ওজন আশঙ্কাজনকভাবে কমছে, তা সামগ্রিক মৎস্য খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান এই সংকটকে চিহ্নিত করে উল্লেখ করেছেন যে, জাটকা বা ছোট ইলিশকে বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত সুযোগ না দিলে বড় মাছ পাওয়া অসম্ভব। পরপর দুই বছর যদি অনিয়ন্ত্রিত জাটকা নিধন চলে, তবে সামগ্রিক উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামাটা স্বাভাবিক। পাশাপাশি উজানের নদীগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ঘাটতি এবং উপকূলীয় মিঠা পানির অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ধেয়ে আসার কারণেও প্রজনন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। পরের বছর ২০২৩-২৪-এ তা কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয়েছে ৫ লাখ ৪ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ৫ লাখ টনেরও নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫—মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৭ হাজার মেট্রিক টন, যা প্রায় ১২ শতাংশের মতো। এর সঙ্গে ২০২৫-২৬-এর সম্ভাব্য পতন যোগ হলে নিম্নমুখী প্রবণতাটি আরও স্পষ্ট হয়। শুধু সার্বিক উৎপাদনই কমেনি, ইলিশের গড় আকার ও ওজন কমে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের ইলিশের উৎপাদন হ্রাসের পেছনে নদী ও সামুদ্রিক পরিবেশের নানাবিধ সংকটও স্পষ্ট। নদীর মোহনা ও প্রজননক্ষেত্রের আশপাশে পানিদূষণ, অবৈধ ও ক্ষতিকর জালের অবাধ ব্যবহার, নাব্যতা সংকটে ডুবোচর সৃষ্টি, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রভাব ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। খাদ্যাভ্যাসের প্রধান উপাদান প্লাঙ্কটনের রূপান্তর এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে প্রজাতিটির প্রাকৃতিক মাইগ্রেশন পথ বদলে যাচ্ছে কি না—তা বৈজ্ঞানিকভাবে উদ্ঘাটন করা দরকার।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সমুদ্রসীমায় ইলিশের ওপর অতি-আহরণের চাপ। সমুদ্র থেকে যদি পরিণত ও ডিমওয়ালা ইলিশ অতিরিক্ত পরিমাণে আহরণ করা হয়, তবে নদীতে ডিম ছাড়ার জন্য পর্যাপ্ত ইলিশ প্রবেশ করতে পারে না। নদীতে জেলেদের কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার বিষয়টি সমুদ্রের অতিরিক্ত আহরণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মৎস্য গবেষক ড. আনিসুর রহমান ও মোল্লা এমদাদুল্লাহ—উভয়েই জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নদী ও সাগরে তদারকি ও নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো এখন সময়ের জরুরি দাবি।
সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি উদ্বেগজনক ও বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন নজরে আসছে—তুলনামূলক ছোট আকারের ইলিশে ডিম বা পরিপক্বতা আসার প্রবণতা। বড় ও পরিণত স্ত্রী মাছগুলো অব্যাহতভাবে আহরিত হতে থাকায় বংশ রক্ষার্থে ইলিশ কি স্বাভাবিকের চেয়ে কম বয়সে পরিপক্ব হয়ে উঠছে? বিজ্ঞান বলে, একটি পূর্ণাঙ্গ পরিণত ইলিশের ডিম বা পোনার টিকে থাকার ক্ষমতা যতটুকু, অপরিপক্ক বা ছোট ইলিশের ডিমের টিকে থাকার হার তার চেয়ে অনেক কম। ফলে এই পরিবর্তন যদি সত্যি ঘটে থাকে, তবে তা ইলিশের সার্বিক প্রজননক্ষমতা ও নতুন প্রজন্মের সংযোজনের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গুজরাট থেকে আসা ইলিশগুলো তুলনামূলক বড় ও ডিমযুক্ত হওয়ায়, দুই দেশের ইলিশের বয়সভিত্তিক বিন্যাস, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত অভিযোজন নিয়ে একটি তুলনামূলক গবেষণা পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে, আমাদের গবেষকদের হাতে ইলিশের জীবন রহস্য বা ‘জিনোম সিকুয়েন্সিং’ উন্মোচিত হওয়া মৎস্য বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী সাফল্য। যা জাতীয় মৎস্য ব্যবস্থাপনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। জিনোম গবেষণার তথ্যকে কাজে লাগিয়ে ইলিশের বংশগত বৈচিত্র্য, লবণাক্ততা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন প্রক্রিয়াকে সূক্ষ্মভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। বঙ্গোপসাগর অববাহিকার নিজস্ব ইলিশের ‘জিন পুল’ টেকসই রাখা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইলিশের সঙ্গে জেনেটিক তুলনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত জিনোমিক ডাটাবেজ গড়ে তোলা সহজ হবে। সর্বোপরি, জিনোম গবেষণার এই বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে অভয়াশ্রম পুনর্বিন্যাস ও কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তির উদ্ভাবনে কৌশলগতভাবে প্রয়োগ করা গেলে টেকসই ইলিশ সংরক্ষণে এক সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটবে।
আমাদের নদীগুলোতে পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার কারণে ইলিশ বিকল্প প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ভারত বা মিয়ানমারের নদনদীতে চলে যাচ্ছে কি না—এই সম্ভাবনাকে কেবল অনুমানের ওপর না রেখে আধুনিক গবেষণার আওতায় আনতে হবে। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারত উপকূলের আঞ্চলিক ইলিশ নিয়ে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করছে। যেহেতু ইলিশ কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত মানায় না, তাই এ ধরনের ট্রাই-ন্যাশন গবেষণার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে ‘আঞ্চলিক মৎস্য কূটনীতি’ জোরদার করে তথ্য আদান-প্রদান ও টেকসই আহরণ নীতি বাস্তবায়ন করা দরকার।
পরিশেষে বলা যায়, ইলিশ নিয়ে আলোচনা কেবল ‘আমদানি বন্ধ’ বনাম ‘আমদানি চালু’—এই দ্বিমুখী বাণিজ্যে আটকে রাখা মোটেও সঙ্গত নয়। সাময়িক বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানি একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু নদীর পরিবেশ রক্ষা, কঠোর নজরদারি, জেলেদের সামাজিক সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আঞ্চলিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া জাতীয় সম্পদের স্থায়িত্ব মেলানো সম্ভব নয়। আজ আমরা কত টাকায় এক কেজি ইলিশ কিনছি, তার চেয়েও বড় এবং ঐতিহাসিক প্রশ্ন হলো—আজ থেকে দশ, বিশ কিংবা ৫০ বছর পরও বাংলাদেশের নদীতে রূপালী ইলিশের চেনা স্রোত বজায় থাকবে তো?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রকল্পের আগে গবেষণা, গবেষণার ভিত্তিতে পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার ফলাফল নিয়মিত মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ ইলিশকে রক্ষা করতে হলে শুধু কত টন মাছ ধরা পড়ল, সেই হিসাব করলেই হবে না; বুঝতে হবে মাছটির পুরো জীবনচক্র। জেলের অভিজ্ঞতা, ভোক্তার কষ্ট, গবেষকের তথ্য—সবকিছুকে এক সুতোয় গাঁথতে হবে। ইলিশের ভবিষ্যৎ বাজারে নয়, শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে নদী, মোহনা ও সমুদ্রের সুস্থতার ওপর।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল- mbashirpro1986@gmail.com
