ভরত রাজার দেউল ঘিরে জমে আছে শত বছরের রহস্য আর ইতিহাসের নানা স্তর

সাইফুল ইসলাম, যশোর

পর্যটকদের কাছে যশোরের ভরত ভায়না বা ভরত রাজার দেউল হয়ে উঠতে পারে এক ঐতিহাসিক প্রত্নরত্ন। প্রায় ২ হাজার বছরের পুরোনো এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি তেমন প্রচার পায়নি। দীর্ঘকাল ধরে এটি যেন পর্যটকদের দৃষ্টির বাইরে থেকে গেছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই প্রাচীন নিদর্শনটি সুন্দরভাবে পর্যটকদের কাছে উপস্থাপনযোগ্য করে তুলেছে। চারপাশে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া হয়েছে। শহর থেকে দূরত্ব একটু বেশি হলেও যোগাযোগব্যবস্থা ভালো। প্রচারণা পেলে এই প্রত্নরত্নটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আকৃষ্ট করবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ভরত ভায়নায় বুড়িভদ্রা নদীর প্রায় ৩০০ মিটার পূর্ব দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন ঢিবি। যাকে ঘিরে জমে আছে শত বছরের রহস্য আর ইতিহাসের নানা স্তর। দূর থেকে দেখলে এটিকে সাধারণ একটি মাটির ঢিবি মনে হলেও, ভিতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন এক স্থাপত্যের গল্প। বিশ শতকের গোড়ার দিকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধায়ক কাশীনাথ দীক্ষিত এই ঢিবি পরিদর্শন করে একে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন এটি চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় উল্লিখিত সমতটের ৩০টি সংঘারামের একটি হতে পারে। যদিও তাঁর এই অনুমান কোনো বিস্তৃত জরিপ, অনুসন্ধান বা পরীক্ষামূলক খননের ভিত্তিতে করা হয়নি। পরবর্তীকালে মিত্র, যাকারিয়া ও আলমের মতো গবেষকরাও দীক্ষিতের এই অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন, ফলে বহু বছর ধরে এই তথ্যটিই প্রচলিত ধারণা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৪-৮৫ ও ১৯৯৬-২০০১ সালে এখানে খননকাজ চালায়। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়ের যৌথ খনন দল ঢিবির উত্তর-পশ্চিমাংশ খুঁড়ে বের করে আনে চমকপ্রদ সব তথ্য। এই খননে উন্মোচিত হয় তিনটি ভিন্ন স্থাপত্যিক কালপর্ব। প্রথম পর্বে ছিল প্রায় ৪২ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি বর্গাকার ইটের কাঠামো, যার দেয়াল সজ্জিত ছিল ফুল-লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার অলংকৃত প্যানেল এবং প্লাস্টার দিয়ে। দ্বিতীয় পর্বে এই বর্গাকার কাঠামোর চার পাশে যুক্ত হয় চারটি বড় অভিক্ষেপ, যার ফলে মন্দিরটির ভূমি-নকশা পুরোপুরি বদলে গিয়ে রূপ নেয় ক্রুশাকৃতিতে- পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৯৯ মিটার আর উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৯৫ মিটার বিস্তৃত এক বিশাল স্থাপনায়। তৃতীয় ও সবচেয়ে জটিল পর্বে গোটা কাঠামোর চারপাশে তোলা হয় একটি উঁচু দেয়াল এবং প্রায় তিন মিটার চওড়া একটি প্রদক্ষিণ পথ, যার শীর্ষের উচ্চতা প্রায় সাড়ে নয় মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। এই পর্বে ব্যবহৃত হয়েছে বড় আকারের ইট, চুন-বালির প্লাস্টার এবং ইটের গুঁড়ো ও মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ দিয়ে তৈরি মেঝে। স্থাপনাটির শীর্ষে রয়েছে একটি উঁচু বর্গাকার ভিত্তিবেদী, যার নিচে সারিবদ্ধভাবে সাজানো মোট ৯৪টি আবদ্ধ প্রকোষ্ঠ- অনেকটা মহাস্থানগড়ের কাছের গোকুল মেধ বা উত্তর প্রদেশের অহিচ্ছত্রের মতো স্থাপত্যরীতির সঙ্গে যার মিল খুঁজে পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা।

যশোরের মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘ভরত ভায়নায় সরকার ৬ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু এখনো দখলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই জায়গাটি দখলে নিয়ে সেখানে একটা ডিসপ্লে সেন্টার নির্মাণ করে যদি ভরত ভায়না থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন নিদর্শনগুলো রাখা হয়, তাহলে এই অনেক পর্যটন এখানে আসবেন।’

যেভাবে যাবেন

যশোর শহর থেকে সড়কপথে কেশবপুর উপজেলা হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় ভরত ভায়নায়। দূরত্ব ৫১ কিলোমিটার। যশোর থেকে বাস বা সিএনজি অটোরিকশাযোগে কেশবপুর বাজার, সেখান থেকে স্থানীয় যানবাহনে অল্প সময়েই পৌঁছানো যায় প্রত্নস্থলে। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে যশোর এসেও একদিনের ভ্রমণে ঘুরে আসা যায় এই ঐতিহাসিক স্থান থেকে। প্রত্নস্থলের আশপাশে খাবার ও বিশ্রামের জন্য স্থানীয় হোটেল ও দোকান থাকলেও থাকার জন্য উন্নত মানের আবাসন সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি, তাই দিনের আলোতেই ঘুরে আসাটা সুবিধাজনক। তা ছাড়া এই প্রত্নস্থানের কাছাকাছিই মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে মহাকবি মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতিবিজড়িত দত্তবাড়ি। একই দিনে পর্যটকরা এই পর্যটন স্পটটিও ঘুরে দেখতে পারেন। এখানে রাত্রীযাপনের জন্য উন্নতমানের সরকারি রেস্ট হাউসও আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights