সোনা চোরাচালান : সাবেক আনসার সদস্যের সিন্ডিকেটে কেবিন ক্রু

মাহবুব মমতাজী

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একাধিক কেবিন ক্রুর বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ দীর্ঘদিন আলোচিত। মর্জিনা আক্তার এলিন, সাদিয়া খানম, হোসনে আরা ও রুদাবা সুলতানা-এ চার কেবিন ক্রুর নাম এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অনুসন্ধানে। তবে এবার এ চক্রের নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ চোরাচালান নেটওয়ার্কের তথ্য। যার মূলে রয়েছেন সাবেক আনসার সদস্য আল-আমিন হোসেন। সিআইডি ও বিমানবন্দর থানা সূত্রে জানা গেছে, আনসার সদস্য থেকে সোনা চোরাচালানের মাস্টারমাইন্ড হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আল-আমিনের একটি শক্তিশালী চক্র। আর এ চক্রের অন্যতম প্রধান বাহক হিসেবে কাজ করেছেন তারই গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম। কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে জুতার ভিতর ৩৪৮ গ্রাম সোনা নেওয়ার ঘটনায় ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল একটি মামলা হয়। ওই মামলার চার্জশিট হয় গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। জানা যায়, ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল ভোরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৫০ নম্বর ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেটে জাহাঙ্গীর আলম দুজন যাত্রীর কাছ থেকে গোপনে তিনটি সোনার বার গ্রহণ করেন। বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের নজরে এলে জাহাঙ্গীরকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে কাস্টমস হলে তল্লাশি চালিয়ে তার পরিহিত বুট জুতার মধ্যে বিশেষ কায়দায় লুকানো ৩৪৮ গ্রাম সোনার বার উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ছিল। জাহাঙ্গীরও আনসার সদস্য ছিলেন।

এদিকে আনসারের সাবেক সদস্য আল-আমিন জানান, আনসারে চাকরি করার সময় হোটেল র‌্যাডিসনে ডিউটি করাকালে কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়। এর পর থেকে তিনি সোনার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এখন তিনি আনসারের চাকরিতে নেই।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন, তিনি মূলত সাবেক আনসার সদস্য আল-আমিন হোসেনের হয়ে কাজ করতেন। বিমানবন্দর থেকে সোনা বের করে বাইরে আল-আমিনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতি চালানে জাহাঙ্গীরকে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো। পরে এ সোনা আল-আমিনের নির্দেশনায় অন্য সহযোগী হামিদুর রহমানকে (৪৫) হস্তান্তর করা হতো। পুলিশ কল ডিটেইলস রেকর্ড বিশ্লেষণ করে আল-আমিন ও হামিদুর রহমানের এই অপরাধ চক্রে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়। পরে এ মামলায় আল-আমিনকেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঝিনাইদহের মহেশপুরের পোড়াবাড়ীতে কম্পিউটার শেখার পর আনসারে যোগ দিয়েছিলেন আল-আমিন। আনসারে চাকরির সুবাদে র‌্যাডিসন হোটেলে দায়িত্ব পালনের সময় বেশ কয়েকজন সোনা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। বিমানবন্দর নিরাপত্তার ভিতরের নেটওয়ার্ক ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দ্রুতই চোরাচালান চক্রের নিয়ন্ত্রণ নেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার, কাস্টমস ও নিরাপত্তারক্ষীদের একাংশকে ম্যানেজ করার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রুদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করত এ সিন্ডিকেট।

চার কেবিন ক্রুর যোগসূত্র : সিআইডির তদন্তে আল-আমিনের সঙ্গে বিমানের চার কেবিন ক্রু মর্জিনা আক্তার এলিন, হোসনে আরা, রুদাবা সুলতানা ও সাদিয়া খানমের যোগাযোগের তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির এসআই মিজানুর রহমান এটি অনুসন্ধান করছেন।

সংস্থাটির অতিরিক্ত ডিআইজি বাছির উদ্দিন জানান, অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অনুসন্ধান শেষে পুরো চক্রের বিস্তারিত জানা যাবে।

গত বছরের ৪ আগস্ট রিয়াদ থেকে আসা বিজি-৩৪০ ফ্লাইটের সিনিয়র কেবিন ক্রু রুদাবার অন্তর্বাস থেকে ২৩০ গ্রাম সোনা জব্দ করা হয়। জানা যায়, মর্জিনা আক্তার এলিনকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনার বারসহ আটক করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগের প্রমাণ পান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বন্ধের দণ্ড দেওয়া হয় এবং সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরে তিনি কাজে যোগ দেন। সাদিয়া খানম ২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর সোনার বারসহ আটক হন। পরদিন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে বিভাগীয় তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও গত বছরের ১৭ আগস্ট তাকে শুধু তিরস্কার দিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

কাস্টম হাউসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিমানবন্দরে শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের ঘটনায় ৫৪১টি মামলা হয়েছে।

সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল বাহকদের গ্রেপ্তার করে এ চোরাচালান রোখা সম্ভব নয়। আল-আমিনের ড্রাইভার জাহাঙ্গীরের মতো মাঠপর্যায়ের বাহক থেকে শুরু করে বিমানের কেবিন ক্রু ও ভিতরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে।

ঝিনাইদহের মহেশপুরের মান্দারবাড়িয়া ইউনিয়নে সরেজমিন দেখা যায়, গ্রাম্য পরিবেশের মধ্যে আল-আমিনের বাড়িটি বেশ আধুনিক ও বিলাসবহুলভাবে তৈরি করা। এক তলাবিশিষ্ট পাকা সুদৃশ্য বাড়ি, যা সম্পূর্ণ রঙিন টাইলস দিয়ে মোড়ানো। বাড়ির সামনের প্রবেশদ্বারে রয়েছে স্টিলের তৈরি কারুকার্যময় বড় গেট এবং গেটের ওপর ও দুই পাশে নীল টাইলসের সুবিন্যস্ত কাজ। ঘরের ভিতরে দেয়াল ও মেঝেতে আধুনিক টাইলস বসানো। ভিতরে ওয়াশবেসিন, আধুনিক ফিল্টার ও ঘরের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় আধুনিকতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।

– প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন আমাদের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি রুহুল আমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights