ডিমের বাজারে বড় সিন্ডিকেট

ইমরান চৌধুরী

গরিবের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত ডিমের বাজারেও এখন অস্থিরতা চলছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ১০ টাকা, দুই মাসে বেড়েছে প্রায় ৩০ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, এভাবে দাম বাড়ার পেছনে পাইকারি ব্যবসায়ী ও বড় প্রতিষ্ঠান ‘সিন্ডিকেট’ হয়ে কাজ করছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করছেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে ডিমের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ পড়েছে বাড়তি চাপে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর-১১ কাঁচাবাজার ও মুসলিম কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ফার্মের বাদামি ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়। সাদা ডিম ১৫০ টাকা। পাড়ামহল্লার বাজারে দাম আরও বেশি। সেখানে বাদামি ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। সে হিসেবে ডজনপ্রতি দাম পড়ছে ১৬৫ টাকা। বাজারে অবশ্য বাদামি ডিমের চাহিদাই বেশি।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেড় থেকে দুই মাস আগেও ডজনপ্রতি ডিমের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ টাকায়। গত সপ্তাহ থেকে আরও ১০ টাকা বেড়ে এখন রাজধানীর খুচরা বাজারে ডজনপ্রতি দাম উঠেছে ১৬০ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সর্বশেষ হিসাবেও ডিমের দাম বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। গতকালের হিসাব অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে ডিমের দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। বাজার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে : ডিমের দাম বাড়ার কারণ নিয়ে খুচরা বিক্রেতা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খামারিদের বক্তব্যে মিল নেই। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকেই তাঁদের বেশি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে। ফলে বাড়তি দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির জন্য উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করছেন। প্রান্তিক খামারিদের অভিযোগ আরও ভিন্ন। তাঁদের দাবি, ডিম উৎপাদন করলেও বাজারদর নির্ধারণে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নেই। কিছু বড় প্রতিষ্ঠান ও ঢাকার আড়তদারদের, বিশেষ করে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির নির্ধারিত দামের প্রভাব দেশের অন্যান্য বাজারেও পড়ে। ফলে উৎপাদক পর্যায়ে কম দামে বিক্রি করলেও ভোক্তাপর্যায়ে ডিমের দাম অনেক বেড়ে যায়।

পোলট্রি খাতের বর্তমান অস্থিরতার পেছনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও বাজার কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি শিল্প রক্ষা অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মফিজুল ইসলাম মল্লিক। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনসহ দেশের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতির মাধ্যমে ডিমের বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রান্তিক খামারিদের ডিম বাজারে আসার সময় কম দামে কিনে নেওয়া হয়। পরে তেজগাঁও সমিতির মাধ্যমে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করা হয়। আবার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত মুরগি ও ডিম বাজারে আসার সময়ও নানা কৌশলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ কারণে মাসের একেক সময়ে মুরগি ও ডিমের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ে, আবার হঠাৎ কমে যায়। তাঁর অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে পরিকল্পনা করে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সমন্বয় করে তারা কখন কত পরিমাণ মুরগি ও ডিম বাজারে ছাড়বে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে প্রান্তিক খামারিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে একপর্যায়ে প্রান্তিক খামারিরা পোলট্রি ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। তখন পুরো বাজার করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রান্তিক খামারিরা টিকে না থাকলে ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হতে পারে। তখন তারা যে দাম নির্ধারণ করবে, ভোক্তাদের সে দামেই পণ্য কিনতে হতে পারে।’ তবে এ অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন ডিম ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ডিম উৎপাদন হয়। প্রতিদিন লাখ লাখ ডিম উৎপাদন ও কেনাবেচা হচ্ছে। সারা দেশের উৎপাদন ও বাজারের তুলনায় তেজগাঁওয়ে যে পরিমাণ ডিম বেচাকেনা হয়, তা খুবই সামান্য। তাই তেজগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা পুরো দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন-এমন অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নেই।

তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি আমানত উল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডিমের দাম এখন কিছুটা বাড়তি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দামও কমে আসবে। আশা করছি সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই দাম কমতে পারে।’ পাইকারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগও নাকচ করে তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের কোনো বিষয় এখানে নেই। আমরা যে দামে ডিম কিনি, সে দামেই বাজারে ছাড়ি। এককভাবে কারও পক্ষে ডিমের দাম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপরই বাজারদর নির্ভর করে।’

অস্থিরতায় জড়িত বড় প্রতিষ্ঠান : কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ডিমের বাজারে অস্থিরতার পেছনে কয়েকটি সিন্ডিকেট গ্রুপ কাজ করছে। এর মধ্যে পাইকারি ব্যবসায়ী ও কিছু বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশে এমন বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি, যার কারণে ডিমের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা।’ বাজার স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত মনিটরিং জোরদার, মজুত ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

প্রান্তিক খামারিরা যা বলছেন : নরসিংদী জেলা খামারিদের মতে জেলার পোলট্রি শিল্পে প্রতিদিনের ডিমের উৎপাদন বেশ ভালো। কিন্তু খুচরা বাজারের এই চড়া দামের সুফল প্রান্তিক খামারিরা পাচ্ছেন না। খামারি ফারুক মিয়া বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠান ও ফিড মিলগুলোর সিন্ডিকেটের কারণে ক্ষুদ্র খামারিরা বাজারে নিজেদের পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ করতে পারছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে লাভের গুড় খাচ্ছে অসাধু চক্র।’ গাজীপুরের শ্রীপুরের খামারিদের অভিযোগ, পোলট্রি শিল্পে সরকারের কার্যকর নজরদারি না থাকায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। ডিমের দাম যেমন ওঠানামা করে, তেমন খাবারসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বাড়ে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উৎপাদন খরচ। শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল আলীম বলেন, ‘মুরগির খাবারের দাম অতিরিক্তবৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিরা লোকসানে আছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ খামারিদের পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কীভাবে উৎপাদন খরচ কমিয়ে এনে ডিম উৎপাদন করে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া যায় এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।’ রংপুরে খামার পর্যায়ে প্রতি পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১ টাকা ২৫ পয়সায়। ওই ডিম পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের হাত ঘুরে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ১৩ থেকে ১৪ টাকা। মাঝখানে প্রতি পিস ডিমে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা লাভ করছেন ৩ টাকার ওপর। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন. হাতেগোনা তিন-চারটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল খামারের মালিকরা ডিমের দাম বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। জেলা পোলট্রি শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরমানুর রহমান লিংকন জানান, ডিম নিয়ে মধ্যস্বত্ব শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তারাই দাম নিয়ন্ত্রণ করে অধিক মুনাফা করছেন। কয়েক দিনের প্রচ- গরমে ৩-৪ শতাংশ মুরগি মারা যাওয়ায় ডিমের উৎপাদন কমার একটি কারণ বলে তিনি মনে করছেন। প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সাভার, রংপুর, গাজীপুর ও নরসিংদী প্রতিনিধি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights