ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা
নূর মুহাম্মদ রাহমানী
মানবতা নির্মাণ ও জ্ঞান-গবেষণার উন্নয়নে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষকই জাতি গঠনের মূল কারিগর। শিশুদের চরিত্র গঠন, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং তাদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাঁরা নিজেদের অর্জিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো দিয়ে শিক্ষার্থী বিবেককে আলোকিত করেন। নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে একেকজন ছাত্রকে দায়িত্বশীল, গবেষক ও ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালান। শিক্ষকতা এমন এক পেশা, যা শুধু ইসলাম নয়; বরং দুনিয়ার প্রতিটি মতাদর্শ এবং সমাজে এর বিশেষ সম্মানজনক অবস্থান রয়েছে।
তবে ইসলাম শিক্ষককে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার চোখে দেখেছে। মহানবী (সা.)-এর অগণিত গুণ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়েছে’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৯)।
নবী, সাহাবি ও তাবেইনদের স্বর্ণযুগে শিক্ষকের খুব গুরুত্ব ছিল। খলিফা হজরত ওমর (রা.) পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষকদের উচ্চপদস্থ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ দিতেন। খলিফা হজরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘আমাকে যিনি একটি অক্ষর শিক্ষা দিলেন, আমি তাঁর ক্রীতদাস। চাইলে তিনি আমাকে মুক্ত করতে পারেন কিংবা বিক্রিও করে দিতে পারেন (তালিমুল মুতাআল্লিম, পৃষ্ঠা : ২১)।
শিক্ষকতা মহান আল্লাহর গুণ : মহান আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি নবী-রসুলদের মাধ্যমে আমাদের ভালোমন্দ সব শিখিয়েছেন। কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দান করেন এবং আল্লাহ সব বিষয় সম্বন্ধে সম্যক অবগত।’ (সুরা বাকারা : ২৮২)।
নবীদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন : একজন শিক্ষক নবী-রসুলদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীতে নবী প্রেরণের গুরুত্বপূর্ণ একটা উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া। শিক্ষকের ভূমিকা পালন করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে তোমাদেরই মধ্য থেকে একজন রসুল পাঠিয়েছি; যিনি তোমাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তোমাদের পরিশুদ্ধ করেন, তোমাদের কিতাব ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেন এবং তোমাদের এমন সব বিষয় শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না’ (সুরা বাকারা : ১৫১)।
সর্বোত্তম পেশা : পৃথিবীতে অজস্র পেশা রয়েছে, কিন্তু শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা আর দ্বিতীয়টি নেই। রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন’ (বুখারি : ৫০২৭)।
সৃষ্টিকুলের দোয়া : শিক্ষক এমন ব্যক্তি যার জন্য সৃষ্টিকুল সবাই দোয়া করতে থাকে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমান ও জমিনের সব সৃষ্টি, এমনকি গর্তের পিপীলিকা এবং সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণ শিক্ষাদাতার জন্য দোয়া করতে থাকে’ (সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৫)।
নবীজির দোয়া : শিক্ষকের জন্য আমাদের প্রিয়নবী (সা.) নিজে বিশেষভাবে দোয়া করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তিকে তরতাজা রাখুন; যে আমার কোনো কথা শুনেছে, স্মরণ রেখেছে এবং যেভাবে শুনেছে সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছে’ (সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬)।
মৃত্যুর পরও দোয়া পাওয়ার উপায় : মৃত্যুর পর মানুষের সব আমলের দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু শিক্ষকতা এমন পেশা যা সঠিকভাবে করে গেলে এবং আদর্শবান ছাত্র গড়ে গেলে কবরে থেকেও সওয়াব পাওয়া যায়।
রসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার তিনটি আমল ব্যতীত সব আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ১. সদকায়ে জারিয়া। ২. এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং ৩. এমন সৎ সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে’ (সুনানে আবু দাউদ : ২৮৮)।
মহান আল্লাহ আমাদের সত্যিকার দরদি শিক্ষক হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ।
