নামেই কি শুধু টাইগার, মাঠে কেন এমন অসহায় আত্মসমর্পণ?
নাজমুল হাসান
০, ০, ০, ২০, ১১, ২১, ২১, ০, ১০, ২৬, ৪, ৩- সংখ্যাগুলো একনাগাড়ে পড়লে আপনি কোনো ফোন নম্বর ভাবতে পারেন, কোনো লটারি বা অন্য কিছুর পিন নম্বর ভাবলেও দোষের কিছু নেই। তবে আপনাকে জানাতে চাই, এগুলো আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্কোরকার্ডের রান। এশিয়ান গেমস ক্রিকেটে জাপানের নিশিনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এমন স্কোরই করেছে লিটন দাসের নেতৃত্বাধীন দল।
প্রথম তিন ব্যাটার- সাইফ হাসান, তানজিদ হাসান ও লিটন দাস; তিনজনই ফিরেছেন শূন্য রানে। এর মধ্যে সাইফ খেলেছেন ৬ বল, তানজিদ ২ এবং লিটন মাত্র ১ বল। অর্থাৎ লিটন ফিরেছেন গোল্ডেন ডাকে। এরপর আর দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাতে পারেননি অধিনায়ক। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, টপ কিংবা মিডল অর্ডার নয়, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েছেন স্পিনার নাসুম আহমেদ। তিনিই করেছেন দলের হয়ে সর্বোচ্চ ২৬ রান।
আর টাইগারদের এমন বিপর্যয়কর কাণ্ডে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় সারির দলের কাছে বড় হেরে জুটল না ব্রোঞ্জও। এমন অসহায় আত্মসমর্পণ! দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিল না দর্শকদের। নিশিনে লিটন দাসের দল ১৬৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৬৩ রানে হেরেছে। নির্ধারিত ২০ ওভারও খেলতে পারেনি। ১৭.৩ ওভারে তারা থেমেছে ১০২ রানে। শ্রীলঙ্কা এশিয়ান গেমসে মূল দল পাঠায়নি। যে উইকেটে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় সারির দল ১৬৫ রান তুলল, সেই একই উইকেটে টাইগাররা পুরোপুরি কুপোকাত।
সর্বশেষ পাঁচটি আন্তর্জাতিক ইনিংসের মধ্যে চারবারই শূন্য রানে ফিরেছেন লিটন দাস- এমন পরিসংখ্যান সামনে এসেছে ম্যাচটির পর। আজ টসে হেরে ফিল্ডিংয়ে নামা বাংলাদেশের শুরুটা হয়েছিল দারুণ। ২১ রান তুলতেই শ্রীলঙ্কা হারিয়েছিল ৪ উইকেট। ১০ ওভারে রান ছিল ৫১। কিন্তু খেলাটা বাংলাদেশের হাতের মুঠো থেকে বের করে দেন মোস্তাফিজুর রহমানের একটি ওভার। মোস্তাফিজ যখন প্রথমবার বোলিংয়ে আসেন, শ্রীলঙ্কার রান তখন ১৩ ওভারে ৫ উইকেটে ৬৫। সেই সময় বোলিংয়ে এসে এক ওভারে ২৫ রান দেন তিনি। সেই ওভারে মোস্তাফিজের কী হয়েছিল, তা তিনিই বলতে পারবেন। ওভারটি শেষ করতে তাঁকে বল করতে হয়েছে ১১টি।
মোস্তাফিজের ২৫ রানের ওভারের পর বোলিংয়ে আনা হয় রিশাদ হোসেনকে। তিনিও সেই ওভারে দেন ১৬ রান। দুই ওভারে ৪১ রান দিয়ে ফেললে আর খেলার নিয়ন্ত্রণ কতটা হাতে থাকে! এরপর শ্রীলঙ্কা দ্রুত রান তুলতে থাকে। বিশেষ করে থারিন্দু রত্নায়েকের ঝড় বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয়। ২৭ বলে ফিফটি করা এই ব্যাটসম্যান শেষ পর্যন্ত ৩২ বলে করেন ৬৫ রান। তাঁর ইনিংসেই শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৬৫ রানে পৌঁছে যায়। রত্নায়েকের ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ৫টি ছক্কা।
একই টুর্নামেন্টে বৃষ্টির কারণে মালয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনাল ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ায় র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার সুবাদে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল বাংলাদেশ। বৃষ্টিতে ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সেমিফাইনালে ওঠে।
তবে সেখানেও পাকিস্তানের মুখোমুখি হয়ে করুণ দশায় পড়ে টাইগাররা। ১৩ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে টেনেটুনে তোলে ১১১ রান। সেখানেও লিটন দাসসহ মূল ব্যাটাররা বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। তৌহিদ হৃদয়ের ৪২ রানে কোনোমতে মুখরক্ষা হয়। তবে সেই রান টপকাতে পাকিস্তানকে বেগ পেতে হয়নি। ১১.৩ ওভারেই তারা জয় তুলে নেয়। ফলে সোনার স্বপ্ন ভুলে টাইগারদের সান্ত্বনা খুঁজতে হয় ব্রোঞ্জে। সেই ব্রোঞ্জও জুটল না। অর্থাৎ এশিয়ার পরিচিত প্রতিপক্ষদের নিয়ে সাজানো এই টুর্নামেন্টে তৃতীয়ও হতে পারেনি কথিত টাইগাররা!
তাই প্রশ্ন উঠছে, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ডের মতো দল থাকলে আসলে কী হতো? আর বৃষ্টি যদি মুখরক্ষা না করত, তবে এই তুলনামূলক সহজ টুর্নামেন্টেও কি লিটনরা সেমিফাইনালের দেখা পেতেন?
কথা বলতে গেলেই লিটনরা হয়তো নানা অজুহাত দেবেন। যেমন পাকিস্তানের বিপক্ষে হারের পর তিনি বলেছেন, পর্যাপ্ত অনুশীলন করতে পারেননি। অথচ তিনি জানতেন, জাপানে গিয়ে খুব একটা অনুশীলনের সুযোগ পাওয়া যাবে না। আবার প্রশ্ন হলো, অনুশীলনের সুযোগ মেলেনি- এই যুক্তি বলে কি পার পাওয়ার উপায় আছে? কারণ, এরা তো খণ্ডকালীন ক্রিকেট খেলেন না; সবাই পেশাদার, সবসময় ক্রিকেটের মধ্যেই থাকাই তাঁদের কাজ। তবে কেন এই অজুহাত?
এটাই প্রথম নয়। যতবার লিটনরা হারেন, ততবারই যেন অজুহাতকে আঁকড়ে ধরেন। কখনো শিশিরের দোষ, কখনো আকাশ পরিষ্কার থাকার দোষ। শিশির পড়লে বল ফসকে যায়, ধরা যায় না, ক্যাচ মিস হয়; সুইং কিংবা টার্ন পাওয়া যায় না। আবার ব্যাটিংয়ের সময়ও বলে ব্যাট ঠিকঠাক মেলে না। আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে আবার নাসুমরা ক্যাচ ধরতে পারেন না। এমন আরও বালখিল্য অজুহাতের কমতি নেই টাইগারদের।
বাচ্চারা স্কুলে যেতে না চাইলে যেমন নানা বাহানা হাজির করে কখনো পেটে ব্যথা, কখনো মাথা ঘোরে, কখনো আবার খেললে ক্ষুধা লাগে না; কখনো ঘুম থেকে উঠলে চোখে ঠিকমতো দেখে না- অজুহাতের ধরনও যেন অনেকটা তেমনই। আর যদি কিছুই বলার না থাকে, তখন তাঁরা বলবেন, ‘আমরা শিখছি, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ মানুষও তাই কৌতুক করে তাঁদের নাম দিয়েছে ‘মায়ের দোয়া ক্রিকেট টিম’। যারা খেলার চেয়ে দোয়ায় বিশ্বাসী। যাদের শিক্ষা সফর যেন শেষ হয় না কখনোই, যাদের লক্ষ্য কেবল পরের ম্যাচ কিংবা ‘নেক্সট বিশ্বকাপ’!
অথচ তাদের পেছনে ব্যয় হয় রাষ্ট্রীয় অর্থ, রয়েছে বিপুল সুযোগ-সুবিধা ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা। ম্যাচ ফির টাকাটা হালাল করার তাগিদটুকুও কি তাঁরা অনুভব করেন না? আর কত এই ‘টাইগার’ নাম করে ডোরাকাটা বিড়াল সেজে বসে থাকা? আর কত দর্শকদের হার্ট অ্যাটাকের ব্যবস্থা করে লাগেজভর্তি শপিং নিয়ে দেশে ফেরা? সেই প্রশ্নগুলোই এখন ভাসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- বারবার ব্যর্থতার পরও কি অজুহাতই থাকবে ঢাল, নাকি একদিন সত্যিকারের টাইগার হয়ে মাঠে নামবে বাংলাদেশ?
