চার কার্গো বিমানে পাকিস্তান কী পাঠাল ইয়েমেনে, কেন বাড়ছে সৌদির সামরিক তৎপরতা?

অনলাইন ডেস্ক
ইয়েমেনে হুথি গোষ্ঠীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সম্ভাব্য এ অভিযানে সহায়তা দিতে গত মাসে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এডেন বন্দরে চারটি কার্গো বিমানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক উপদেষ্টারাও ইয়েমেনে সৌদি উপদেষ্টাদের সঙ্গে কাজ করছেন। অন্যদিকে, হুথিদের দখলে থাকা কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারকে সামনে রেখে অভিযানের সম্ভাব্য পরিকল্পনা সাজাচ্ছে রিয়াদ। খবর রয়টার্সের।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অস্ত্র সরবরাহ ও ইয়েমেনে দেশটির সামরিক উপদেষ্টাদের উপস্থিতির খবর প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই।

রয়টার্সকে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। তবে এর সুনির্দিষ্ট সময় এখনো নির্ধারিত হয়নি। সৌদি আরবের তত্ত্বাবধানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী স্থল অভিযান চালাবে এবং তাদের সহায়তায় বিমান হামলা চালাতে পারে সৌদি সামরিক বাহিনী।

অভিযানের সম্ভাব্য দুই পরিকল্পনা

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব দুটি সম্ভাব্য পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। প্রথমটি হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় সীমিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযান চালানো। দ্বিতীয়টি হলো, ইয়েমেনের একাধিক প্রদেশে সমন্বিত আক্রমণ চালিয়ে হুথিদের অবস্থান দুর্বল করা।

দ্বিতীয় পরিকল্পনায় আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। অভিযানের পরিধির ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছয় ব্যক্তি।

সৌদি আরবের লক্ষ্য শুধু হুথিদের সামরিক অবস্থানে আঘাত করা নয়, বরং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়াও। বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলে বড় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, হুথিদের হাতে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকলে তাদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনায় সৌদি আরবের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

চার কার্গো বিমানে পাকিস্তানের অস্ত্র

ইয়েমেনে সম্ভাব্য অভিযান ঘিরে সৌদি আরবের সামরিক প্রস্তুতিতে পাকিস্তানের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত মাসে এডেনে চারটি কার্গো বিমানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ।

এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা দিতে পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারা সৌদি উপদেষ্টাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বলেও জানিয়েছেন পাকিস্তানি, উপসাগরীয় ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া সৌদি আরবে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে বলে দাবি করেছেন পাকিস্তানের আরেক কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের স্থলসীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করতে এসব সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর বিষয়ে ইসলামাবাদ এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে তুরস্কও। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কের তৈরি ড্রোন ইয়েমেনে মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য জানতে চেয়ে তাৎক্ষণিক সাড়া পায়নি রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা, ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি

সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে সহায়তা করতে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। তবে সৌদি আরবের অনুরোধ সত্ত্বেও সরাসরি বিমান হামলায় সহায়তার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মতি দেননি বলে এর আগে জানিয়েছিল রয়টার্স।

অন্যদিকে, লোহিত সাগরের বন্দরনগরী ইয়ানবুর নিরাপত্তায় সহায়তা দিতে সৌদি আরবে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।

সৌদি আরবের উদ্বেগের বড় কারণ হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ড ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বেড়েছে। হুথিদের হামলায় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

স্থলযুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ

তবে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুথিবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। অতীতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজন রয়ে গেছে।

ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার মতে, হুথিদের মতো সুসংগঠিত সামরিক শক্তিকে পিছু হটাতে ধারাবাহিক ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু হুথিরা একাধিক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করলে তাদের বিরোধী বাহিনীগুলোর সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবিও সতর্ক করেছেন, অভিযানের ফল অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থলবাহিনীর কার্যকারিতার ওপর।

২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে দেশটি আরব জোটের নেতৃত্ব দেয়। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংঘাত কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক উত্তেজনায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

সম্ভাব্য অভিযান নিয়ে সৌদি ও ইয়েমেনি সরকার, হুথি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্য জানতে চেয়েছিল রয়টার্স। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: রয়টার্স, মিডল ইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights