মেজর আক্তার-সালমান ও তারা ক’জনের বিতর্কের আড়ালে কোন বয়ানের রাজনীতি?

আহসান হাবিব বরুন

রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু সময় এমন হয়, যখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা আর শুধু ঘটনা থাকে না; বরং বক্তব্য, আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও বিভিন্ন বিতর্ক বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশও বর্তমানে তেমনই এক স্পর্শকাতর সময় অতিক্রম করছে বলে মনে করেন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহসান হাবিব বরুন।

লেখকের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন ও জবাবদিহির কাঠামো পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে, তখন জনপরিসরে আলোচিত বিভিন্ন ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নাকি এর আড়ালে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হচ্ছে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

লেখায় মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জন ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে একই সূত্রে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। লেখকের দাবি, দুজনের ক্ষেত্র আলাদা হলেও তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন কিছু মিল রয়েছে, যা রাষ্ট্র ও বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরির সুযোগ তৈরি করছে।

তবে লেখক একইসঙ্গে দেশের বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কাস্টমস ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু অসাধু সদস্যের সিন্ডিকেট, লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, ইমিগ্রেশন জটিলতা এবং অন্যান্য হয়রানি প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

লেখকের মতে, এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের অব্যবস্থাপনা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে উন্নত, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি-সংকটকে কেন্দ্র করে মেজর আক্তারুজ্জামান রঞ্জনের বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে আচরণকে তিনি শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন। লেখকের ভাষ্য, কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে গায়ে হাত তোলার হুমকি দেওয়া বা ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার মতো বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদের পদ্ধতি হতে পারে না।

এর বিপরীতে, একই বিমানে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন সংসদ সদস্য বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরে আইনি প্রতিকার ও সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। লেখকের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও পরবর্তী সময়ে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

লেখকের মতে, এ দুই ধরনের আচরণের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট—একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগ জানানো, অন্যদিকে সরাসরি ক্ষমতা প্রদর্শন ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা।

মেজর আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করার সময় তাঁর আচরণ নিয়েও লেখায় সমালোচনা করা হয়েছে। প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে পুলিশের নিরাপত্তা হেলমেট ছুড়ে ফেলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বাদানুবাদ এবং আদালতের ভেতরে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাকে লেখক আদালত ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে হেয় করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও আক্তারুজ্জামান দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অতীতে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তিনি প্রকাশ্যে পতিত সরকারের প্রশংসা করেছেন বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ড থেকে আক্তারুজ্জামানের রাজনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

লেখক বিষয়টিকে নতুন প্রজন্মের ওপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রভাবের দিক থেকেও দেখেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও পাবলিক ফিগারদের আচরণ ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তাঁদের কর্মকাণ্ড থেকে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ প্রভাবিত হতে পারে।

লেখায় ইসলামের শিক্ষা ও রাজনৈতিক আচরণের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। কুরআনে সংযম, সহনশীলতা, সুন্দর ভাষায় কথা বলা ও ক্ষমাশীলতার যে নির্দেশনা রয়েছে, তার সঙ্গে মেজর আক্তারুজ্জামানের আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ প্রশ্ন তুলেছেন লেখক। একইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান ও তাদের নেতাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

লেখকের অভিযোগ, আক্তারুজ্জামানের কর্মকাণ্ডের পর জামায়াতে ইসলামী তাঁর আচরণের নিন্দা না করে বরং তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। এ অবস্থানকে তিনি দলটির রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন।

অন্যদিকে, সালমান মুক্তাদিরের কর্মকাণ্ড নিয়েও লেখায় নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। লেখকের দাবি, স্বৈরাচারী আমলে সুবিধাভোগী বিভিন্ন মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তিনি কৌশলী অবস্থান নেন। তবে অতীতে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

সম্প্রতি সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও এবং তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের মালিকানাধীন ফু-ওয়াং ক্লাবকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার প্রসঙ্গও লেখায় এসেছে। লেখকের দাবি, অভিযান-পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালমান মুক্তাদির সরকারের বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজ’ অভিযোগ তুলে সংস্কারকামী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছেন।

ফু-ওয়াং ক্লাবসহ কয়েকটি হোটেল ও লাউঞ্জে অভিযান চালিয়ে শুল্ক-ফাঁকি, অবৈধভাবে মদ মজুত, অননুমোদিত ক্যাসিনো ও অন্যান্য অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়েছে লেখায়। একইসঙ্গে শেখ নূর ইসলামের বিরুদ্ধে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও তোলা হয়েছে। সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধেও অতীতে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেজর আক্তারুজ্জামান ও সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে পাশাপাশি রাখলে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান সামনে আসে। তাঁর দাবি, একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরকারকে ‘চাঁদাবাজ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ—এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে তিনি মনে করেন।

লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, দেশের ভেতরে কিছু ব্যক্তি এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত কথিত সাংবাদিক ও ইউটিউবাররা এসব বিতর্ককে ব্যবহার করে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সত্যকে বিকৃত করা, গুজব ছড়ানো এবং পতিত সরকারের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগও করা হয়েছে।

লেখকের মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—পতিত ও পলাতক আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বিদেশে বসে যারা বয়ান তৈরি করছে, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক বয়ানের কিছুটা মিল রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বিএনপির রাজনৈতিক বিরোধিতায় গিয়ে কৌশলগতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের আঁতাত করেছে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।

তবে লেখক স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, জামায়াতে ইসলামী যদি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য পতিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় যায়, সেটি দলটির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে জামায়াতই বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

জামায়াতে ইসলামীকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ও সংস্কারকামী সরকারের সহযোগী এবং গঠনমূলক সমালোচকের ভূমিকায় থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন লেখক। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তৈরি হওয়া দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও শূন্যতা দূর করে দেশ পুনর্গঠনে সরকারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন।

একইসঙ্গে তিনি মনে করেন, অস্থিতিশীলতা তৈরি করে দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা জামায়াতে ইসলামীর জন্য রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় হবে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মান্ধ নয়—এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতকে জনসম্পৃক্ত ও বাস্তবমুখী ইস্যুতে রাজনীতি করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

লেখক বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি নিয়েও নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এ দেশের মাটিতে বিএনপির রাজনৈতিক শিকড় গভীর এবং দলটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। বিপরীতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের কারণে দলটি রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

লেখার শেষাংশে মেজর আক্তারুজ্জামান ও সালমান মুক্তাদিরের কর্মকাণ্ডকে একই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকের মতে, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি কিংবা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর—যে-ই হোক, আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশৃঙ্খল আচরণ ও অপপ্রচার ঠেকাতে তথ্যভিত্তিক জবাব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডকে অতিরিক্ত প্রচার না দিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা উচিত।

পরিশেষে লেখক বলেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর দেশ যখন আইনের শাসন, সামাজিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তিকর বয়ানের মাধ্যমে পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টা সফল হওয়া উচিত নয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল : ahabibhme@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights