দুই হাত নেই, তবু থামেনি দুঃখু মিয়ার লড়াই
সঞ্জিত সাহা, নরসিংদী
দুই হাত নেই। পা দিয়েই ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে প্রতিদিন শিশুদের পাঠদান করেন আলতাফ হোসেন। তাঁকে এলাকায় দুঃখু মিয়া নামে চেনে সবাই। জন্ম থেকেই দুই হাত নেই তাঁর। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামাতে পারেনি। পড়াশোনা শেষে চাকরির জন্য ঘুরেছেন। চাকরি না পেয়ে নিজের পৈতৃক জমিতে গড়ে তুলেছেন বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়ে এখন পড়াশোনা করছে ১৪৫ শিশু। নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম তাঁর।
পাঁচদোনা ইউনিয়নের দিঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় তাঁর পড়াশোনা। হাত না থাকায় পা দিয়ে লেখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। দুঃখু মিয়া বলেন, ‘আমার বাবা পা দিয়ে লিখতে শেখান। পাতিলের কালি ও পানি মিশিয়ে কঞ্চি কলাপাতায় রেখে দুই পায়ের আঙুলের ফাঁকে ধরে ধীরে ধীরে তাঁকে লেখার অভ্যাস করানো হয়। এরপর পা দিয়েই লিখে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি পাস করেছি।’
শিক্ষাজীবন শেষে শুরু হয় তাঁর কর্মসংস্থানের সংগ্রাম। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও ভাইভায় গিয়ে বারবার বাদ পড়েছেন।
দুঃখু মিয়া বলেন, ‘লিখিত পাস করে ভাইভাতে গেলেই বাদ পড়তাম।’ একপর্যায়ে শুরু করেন টিউশনি করানো। সেখান থেকে কিছু টাকা সঞ্চয় করেন। পরে বাবার দেওয়া জমিও বিক্রি করেন। সেই অর্থ দিয়ে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে পাঠদান করা হয়। বর্তমানে ১৪৫ শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন ১০ শিক্ষক। রয়েছেন আরও দুজন কর্মচারী। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ। বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেড ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন দুঃখু মিয়া। কখনো গল্পের ছলে, কখনো হাসিমুখে শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি। দুই হাত না থাকার বিষয়টি যেন তাঁর পাঠদানের ক্ষেত্রে কোনো বাধাই নয়। দুঃখু মিয়া বলেন, ‘আমি এলাকার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো বিলিয়ে যেতে চাই। আরও চাই, কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষা নিতে ফিরে যেতে না হয়।’ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মানিও অনেক সময় প্রত্যাশিত মাত্রায় দিতে পারেন না। ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টিকে একটি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দুঃখু মিয়া। তাঁর আরও ইচ্ছা, প্রতিষ্ঠানটি একদিন বড় পরিসরে গড়ে উঠবে।
তাঁর এই সংগ্রামে এখন পাশে রয়েছেন নিজের ছেলেও। বাবার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন মোহাইমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাবা সমাজে শিক্ষা প্রসারে কাজ করছেন।’ স্থানীয় বাসিন্দা করিম বলেন, দুই হাত না থাকলেও দুঃখু মিয়া সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর এই অবদানের জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।’ সহকারী শিক্ষক আসমা বেগমের কাছে দুঃখু মিয়া সাহসের প্রতীক। তিনি বলেন, ‘স্যারের জীবন আমাদের প্রতিকূল স্রোতে এগিয়ে চলার সাহস জোগায়।’
