কুড়িগ্রামে সাবেক ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার সমন্বয় পাড়া উচ্চ বিদ্যালয় এক দশকেও কাটেনি সংকট শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
দীর্ঘদিনের শিক্ষাবঞ্চনা ঘুচিয়ে শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় সমন্বয় পাড়া উচ্চবিদ্যালয়। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্তও হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি।

জরাজীর্ণ টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষে, নেই পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক পাখা, শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক। এর সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এমপিওভুক্তির পরও বিদ্যালয়টিতে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। ফলে যে প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে পড়া এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর কথা, সেটির কার্যক্রম নিয়েই এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষগুলোর টিনের চাল পুরোনো ও জরাজীর্ণ। বৃষ্টি হলে চাল চুইয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। এতে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক পাঠদানও ব্যাহত হয়। কোনো কোনো শ্রেণিকক্ষে বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা নেই। শৌচাগার ও গোসলখানার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। গরমের মধ্যে পাখা ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠ গ্রহণ এবং বৃষ্টির সময় পানি পড়া ছাদের নিচে বসে ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময়েও এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না হওয়ায় বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ১৭২ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় শ্রেণিকক্ষে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। ওই দিনের পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষার্থীসংখ্যার তথ্যের সঙ্গে সরেজমিনের চিত্রের পার্থক্য থাকায় নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থী তালিকা ও দৈনিক উপস্থিতির নথি যাচাই করলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা নিয়েও রয়েছে অসংগতি। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের নিয়োগ নীতিমালা অনুসারে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা আটজন হওয়ার কথা। অথচ বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় ১২ জনের নাম পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত চারজনের নাম কীভাবে হাজিরা খাতায় অন্তর্ভুক্ত হলো, তাঁরা কোন পদে কর্মরত এবং তাঁদের নিয়োগ ও বেতনভাতার উৎস কী, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত জনবলকাঠামো, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ও এমপিওসংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১০-এর সংশোধনী ২০১৩ অনুসরণ না করেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছেন। তবে কারা কোন পদে এবং কী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও নথিপত্রের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পরীক্ষা করা জরুরি। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হলেও সেটির কার্যকর ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ল্যাবে নিয়মিত ক্লাস হয় না। ফলে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। একইভাবে বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক থাকলেও নিয়মিত সংগীতচর্চা হয় না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সরকারি পাঠ্যবই সরবরাহের পরও কিছু বই শিক্ষার্থীদের হাতে না পৌঁছে শ্রেণিকক্ষে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বইগুলো কেন বিতরণ করা হয়নি, কোন শ্রেণির কতজন শিক্ষার্থী বই পায়নি এবং ডিজিটাল ল্যাব ও সংগীত শিক্ষার কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়েও জবাবদিহি প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুজ্জামান বলেন, “বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত। এই এলাকার সন্তানদের জন্য এটি একটি আশার জায়গা। কিন্তু অবকাঠামোর এমন বেহাল দশা দেখে কষ্ট লাগে। যে প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের আলোর পথ দেখাবে, সেই প্রতিষ্ঠানই যেন নানা সমস্যায় অন্ধকারে পড়ে আছে।” তাঁর মতে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এলাকার শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। গরমের সময় পাখা না থাকায় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকতেও কষ্ট হয়। তাদের দাবি, দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত সংকটের দৃশ্যমান সমাধান হয়নি। এমপিওভুক্তির পর প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতি, নিয়োগের বৈধতা এবং সরকারি শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু অবকাঠামো সংস্কার নয়, বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক-কর্মচারীর অনুমোদিত পদসংখ্যা ও নিয়োগের বৈধতা যাচাই, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত এবং ডিজিটাল ল্যাব ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর-ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফুলবাড়ী উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুস সালাম বলেন, বিদ্যালয়টির অবস্থা সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনও করেছেন। তবে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা, শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার ও অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলারা আকতার মন্তব্য করতে রাজি হননি।

শিক্ষাবঞ্চিত একটি এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এমপিওভুক্তির পরও কেন নিশ্চিত হয়নি ন্যূনতম শিক্ষার পরিবেশ? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অবকাঠামোগত সংকট নিরসন, নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত এবং নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights