সব ক্ষেত্রেই সরব বাংলার নারী
সাইফ ইমন
এভারেস্ট জয় করে কেউ মহান হয় না, হৃদয় এভারেস্টের মতো বিশাল হলে কেউ কেউ এভারেস্টের পথে পা বাড়ায় এমনই একজন বাংলাদেশি নুরুন্নাহার নিম্মি। চলতি বছরের ২৭ মে নেপাল সময় ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেন এই নারী পর্বতারোহী। নিম্মি তৃতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ এই শৃঙ্গ জয় করেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশে নারী পর্বতারোহী অনেকেই আছেন। যারা নিয়মিত বিশ্বের নানা পর্বত জয় করেছেন। সুনাম বয়ে আনছেন। এমন দুঃসাহসিক অভিযান কোনো সাধারণ যাত্রা নয়। হিমশীতল আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতা, ভয়ংকর খাড়া পথ এবং মৃত্যুঝুঁকি সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হয় পর্বতারোহীদের। সেই কঠিন পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। কোনো নারীর ব্যক্তিগত সাফল্য যখন দেশের
বৈশ্বিক সাফল্যে পরিণত হয় তখন তা বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, সাহস এবং সম্ভাবনারও প্রতীক।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২৬’ বা ‘বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী পুরুষের বৈষম্য কমার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। এ বছর ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ৭৯তম। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে নারী পুরুষের ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। শিক্ষায় নারী পুরুষ সমতায় স্কোর ৯৬ দশমিক ১ যা বাংলাদেশের এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার লড়াইয়ে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬। এটি গত বছরের তুলনায় অপরিবর্তিত। তবে সামগ্রিক অবস্থানে দ্বিগুণ পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ প্রথম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী সালমা আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশবিদেশে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে নারীরা এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। নারীরা নিজেরাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করছেন এবং সেখানে সফল হচ্ছেন। অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, নারী শিক্ষা, নারীর কর্ম এবং নারীর ক্ষমতায়ন সব ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। কারও অপেক্ষা বা সাহায্যের আশায় না থেকে বর্তমানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাই হয়ে উঠেছেন উদ্যোক্তা। সেলাই কাজ, নকশিকাঁথা, শাড়ি-কাপড়, রূপসজ্জা, গৃহসজ্জা, বেকারি ও হোমমেড ফুড এবং অনলাইন ই-কমার্স সবখানেই নারীদের জয়জয়কার। পরিবারের ছোটদের শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে নারীদের এই উদ্যোক্তা হওয়া অনেক কাজে আসবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমাজের সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের তুলে ধরতে হবে।
জনপ্রিয় ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম এজেন্সি ‘গো গার্লস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া রিফাত বলেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে, দেশের অর্থনীতি ও সমাজে নারীর অংশগ্রহণ এখন আর শুধু চাকরি বা পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই। নারী উদ্যোক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রযুক্তি, ফ্যাশন, কৃষি ও অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগে নিজ সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভ্রমণেও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। একসময় যেখানে একা ভ্রমণকে নারীদের জন্য কঠিন মনে করা হতো, এখন অনেক নারীই দেশবিদেশ ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন এবং নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তা ও নারী পর্যটকের এই অগ্রযাত্রা নারীর স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে। নিরাপদ পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই অগ্রযাত্রা আরও বিস্তৃত হবে। নারীরা সংসার ও পেশার দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিজের আনন্দ ও স্বপ্নকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন-এটা আমার কাছে খুব আশাব্যঞ্জক। আমি বিশ্বাস করি, নিরাপদ পরিবেশ, সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে নারীদের এই অগ্রযাত্রা আরও অনেক দূর যাবে।
বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক নারী রেসার কাশফিয়া আরফা মনে করেন দেশের নারীরা দুর্দান্ত সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। এফআইএ এএসএন রেসিং লাইসেন্সধারী (এমন লাইসেন্স যা কোনো দেশের মোটরস্পোর্টস গভর্নিং বডি কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি অফিশিয়াল অনুমতিপত্র, যা চালকদের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন মোটরস্পোর্টস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়) এই নারী বলেন, আমাদের দেশের নারীদের অনন্য বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে সফল হতে হয়। যা নিউইয়র্ক কিংবা সিডনিতে বসবাসকারী নারীদের সম্মুখীন হতে হয় না। যদি খেলাধুলার কথা বলেন তাহলে অনেক কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে সমাজের সঙ্গে যুদ্ধ করে একজন নারী ক্রীড়াবিদ তৈরি হয় আমাদের দেশে। যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক সাফল্য পেয়ে যাচ্ছে। অলিম্পিক, খেলার মাঠ কিংবা দাবার টেবিল আউটডোর- ইনডোর উভয় ক্ষেত্রেই নারীরা এগিয়ে। আমাদের দেশে এখনো নারীকে গাড়ির চালক হিসেবে দেখে মানুষ খুব একটা অভ্যস্ত নয়। পথে বের হলে এটা তীব্রভাবে অনুভব করি। কিন্তু ‘তুমি পারবে না’ এটা বলে কোনো নারীকে আর আটকে রাখা যাবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজির গবেষক ও অধ্যাপক ড. তাহসিনা ফারাহ সনম বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ও তাঁদের অবদান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারীর জন্য এ খাতে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে। এই বিরাট সংখ্যক নারীদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য নীতিগত, সামাজিক ও শিক্ষাগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় বাংলাদেশে নারীরা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। জ্ঞান ও বিজ্ঞান গবেষণায় বাংলাদেশি নারীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। অণুজীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। গবেষণায় বাংলাদেশি নারীদের সাফল্য আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
