ডিপি ওয়ার্ল্ডে বদলে যাক চট্টগ্রাম বন্দর
আহসান হাবিব বরুন
একটি বন্দরের অচলাবস্থা শুধুমাত্র জাহাজের অপেক্ষা বাড়ায় না; থামিয়ে দেয় কারখানার উৎপাদন, বাড়িয়ে দেয় পণ্যের দাম, দুর্বল করে রপ্তানির প্রতিযোগিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ভাবমূর্তি। বন্দরের কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও যখন হাজার হাজার ডলারের অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করতে পারে, তখন সেই বিলম্বের বোঝা শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ভোক্তা এবং সাধারণ মানুষের ওপর। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন নিছক অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিচালিত মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করা হয়। ১৮৮৮ সালে প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা এই বন্দর আজও দেশের আমদানি-রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ এবং রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য এবং পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য যখন দ্রুততর, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে, তখন আমাদের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে পুরোনো পদ্ধতি ও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে রাখার সুযোগ নেই।
এই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগকে তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ। যথাযথ শর্ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এই পদক্ষেপ চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কেবল যন্ত্রপাতি পরিচালনা করে না; বরং টার্মিনালের প্রতিটি ধাপকে একটি সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও সময়সাশ্রয়ী ব্যবস্থার আওতায় আনার অভিজ্ঞতা রাখে। কনটেইনার কোথায় রাখা হবে, কোন জাহাজে কখন পণ্য ওঠানো-নামানো হবে, কীভাবে ইয়ার্ডের জায়গা সর্বোচ্চ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হবে, কীভাবে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো যাবে এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদান দ্রুত করা যাবে— এসব ক্ষেত্রেই দক্ষ পরিচালনব্যবস্থা বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে এই সমন্বিত দক্ষতাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক বন্দর ও লজিস্টিকস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এনসিটির পরিচালনায় তাদের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, উন্নত টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কনটেইনার ট্র্যাকিং এবং পরিকল্পিত ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানো এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর ব্যবহার আরও দক্ষ করে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি : বন্দরের সাফল্য শুধু কতটি কনটেইনার ওঠানো-নামানো হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি জাহাজ কত দ্রুত জেটিতে ভিড়তে পারছে, কনটেইনার কত দ্রুত খালাস হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা কত সহজে পণ্য হাতে পাচ্ছেন, পরিচালন ব্যয় কতটা কমছে এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য জাহাজে তোলা যাচ্ছে কি না— এসবই প্রকৃত দক্ষতার সূচক। ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা যদি এই সূচকগুলোতে বাস্তব উন্নতি আনতে পারে, তবে তার সুফল শুধু এনসিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম এবং দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে সেখানে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। অর্থাৎ, বন্দরের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হলে তার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। চুক্তির আওতায় এনসিটি আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ এবং অটোমেশনের জন্য ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন ৫ কোটি ডলার পাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজস্ব ভাগাভাগির ভিত্তিতে প্রতি একক কনটেইনার থেকে অর্জিত আয়ের ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষের পাওয়ার ব্যবস্থা, বছরে ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি এবং বাৎসরিক সর্বনিম্ন ১২ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বাধ্যবাধকতার কথাও রয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে জরিমানার ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে অপারেটরের ওপর দায়বদ্ধতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
এই আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্তগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে রাষ্ট্রের জন্য রাজস্ব আয়, প্রযুক্তি সংযোজন এবং পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বন্দরের জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা রাষ্ট্র তথা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই অক্ষুণ্ণ থাকার বিষয়টি। অর্থাৎ, পরিচালনায় আন্তর্জাতিক দক্ষতা যুক্ত করার উদ্যোগকে রাষ্ট্রের মালিকানা ত্যাগের সঙ্গে এক করে দেখার কারণ নেই। বরং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোই হতে পারে এই ব্যবস্থার প্রধান শক্তি। তবে চুক্তির পূর্ণ শর্ত, আর্থিক কাঠামো, বিনিয়োগের সময়সূচি ও দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো স্বচ্ছ রাখা জরুরি, যাতে জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।
বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরের অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে যে, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক অপারেটরের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন প্রধান কনটেইনার টার্মিনালেও ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এপিএমের মতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, একটি বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি দক্ষ পরিচালনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত সেবা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য। তবে অন্য দেশের সাফল্যকে সরাসরি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্যের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না; বরং সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে কাজে লাগাতে হবে।
বাংলাদেশের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটরের সম্পৃক্ততার অভিজ্ঞতাও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেখানে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশীয় পরিচালনায় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৭টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিপরীতে বর্তমানে ঘণ্টায় ২০টিরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কথা বলা হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ পরিচালনব্যবস্থা যুক্ত হলে উন্নতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইভাবে এনসিটিতেও উপযুক্ত যন্ত্রপাতি, কার্যকর পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে সেবার মান উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার অর্থ এই নয় যে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করলেই চট্টগ্রাম বন্দরের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটি টার্মিনালের কার্যকারিতা বাড়লেও কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা, সড়ক যোগাযোগের দুর্বলতা, রেল ও নৌপথে কনটেইনার পরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং অফ-ডকের সক্ষমতার ঘাটতি থেকে গেলে সামগ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই এনসিটির আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পেপারলেস অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট, দ্রুত পণ্য খালাস এবং বন্দর থেকে দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানো গেলে সড়কের ওপর চাপ কমবে এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাসের সুযোগ তৈরি হবে।
শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চুক্তির শর্ত ও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত নিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। বিদ্যমান জনবলকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা গেলে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়বে এবং তাদের পেশাগত উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার যেমন বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি আধুনিকায়নের নামে তাদের যৌক্তিক উদ্বেগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে শ্রমিক, প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও অপারেটরের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার কার্যকর সমাধানেও এই পরিবর্তনকে কাজে লাগাতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে জিম্মি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে জন্য পেশাদার প্রশাসন, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, কার্যকর নিরীক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কার্যক্রমও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিনিয়োগের অগ্রগতি, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি, জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসের সময়, রাজস্ব আয় এবং ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত মাশুলের মতো সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ করা গেলে চুক্তির সাফল্য পরিমাপ করা সহজ হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এই উদ্যোগ একটি সুযোগ, আবার একই সঙ্গে একটি দায়িত্বও বটে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো গেলে সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখাতে পারবে। কিন্তু সেই অগ্রগতির স্থায়িত্ব নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষা, ব্যবসায়ীদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর। বিদেশি অপারেটরের নাম বা আন্তর্জাতিক পরিচিতি নয়, বরং বাস্তব ফলাফলই হবে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি।
চট্টগ্রাম বন্দরকে বদলাতে হলে পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি, পেশাদার পরিচালনা এবং জবাবদিহির নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা সেই পরিবর্তনের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। যথাযথ তদারকি, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা বজায় রেখে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দর আরও দক্ষ, প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপযোগী হয়ে উঠতে পারে। তার সুফল পৌঁছাতে পারে শিল্পোদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক, শ্রমিক, ভোক্তা এবং দেশের সাধারণ মানুষের কাছে।
সুতরাং অনিয়ম ও দুর্নীতির বদনাম কাটিয়ে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে উঠুক বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম গতিশীল বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা এবং সরকারের কার্যকর তদারকির সমন্বয়েই সম্ভব এই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। কারণ, বন্দরের উন্নতি মানে শুধু কনটেইনারের গতি বৃদ্ধি নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, বাণিজ্যকে আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং ভবিষ্যৎকে আরও সম্ভাবনাময় করে তোলার অঙ্গীকার। মহান আল্লাহ সুবাহানাতালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
