দারিদ্র্য বিমোচন : প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের পথে

মো. মোর্শেদ হাসান খান

রাজধানীর আদাবর থানার সামনের রিং রোড। ২৬ আগস্ট বিকেল ৫টা। পেডাল রিকশা নিয়ে বসে ছিলেন ৯০ বছর বয়সী শাহজাহান মিয়া। সারা দিন রিকশা চালিয়ে আয় হয়েছিল মাত্র ১৫০ টাকা। দুপুরের খাবারও খেতে পারেননি শাহজাহান।

কারণ ১৫০ টাকা থেকে রিকশার মালিককে দিতে হবে ১০০ টাকা। হাতে থাকবে ৫০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাড়ির জন্য কিছু খাবার কিনতে হবে। কিন্তু কী কিনবেন, সেটিও ঠিক করতে পারছিলেন না শাহজাহান।

একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথা বলতে বলতে নিজের সংসারের কথা জানান তিনি। বলেন, প্রায়ই এক বেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হয়। কখনো ঘরে খাবার থাকে না। তখন প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খাবার চেয়ে নিতে হয়। সেদিনও তাঁর চিন্তা ছিল একই, রাতে পরিবারের সবাই কী খাবে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে শাহজাহান মিয়ার মতো মানুষের সংখ্যা কয়েক কোটি।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। শাহজাহান মিয়াদের অভুক্ত থাকার গল্প আর দারিদ্র্য বিমোচনের পরিসংখ্যান—এই দুটির মাঝের ব্যবধানই আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা। প্রশ্ন, কেন এখনো শাহজাহান মিয়ারা

কষ্টে দিনাতিপাত করছেন? কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চারদিকে যখন দারিদ্র্য হ্রাসের জয়ধ্বনি, সেখানে আজ কেন শাহজাহান মিয়াদের এই অবস্থা? এর কারণ বুঝতে ইতিহাস এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের মিথ্যা বুলির পুনঃপাঠ জরুরি।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তার পরের ইতিহাস সবারই জানা। আমরা যদি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ফিরে যাই, তাহলে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের গ্লোবাল রিসার্চ অধ্যাপক ড. নাওমি হোসাইনের ‘দ্য এইড ল্যাব’ বইয়ে বর্ণিত বিষয়গুলো দেখতে পাই। তিনি লিখেছেন, ১৯৭১-৭২ সালেও এক ধরনের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ছিল, কিন্তু তা ভারতের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছিল, যেখানে যুদ্ধের ফলে এক কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। অর্থাৎ পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষের মতোই ছিল। ১৯৭৪ সালের আগেও বাংলাদেশ বহু বছর ধরে দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছিল। যুদ্ধের পর ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে বিপুল পরিমাণে বিদেশি সাহায্য প্রবাহিত হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৪ সালের দিকে তা হ্রাস পেতে শুরু করে এবং ত্রাণমূলক সহায়তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের দিকে স্থানান্তরিত হয়।

সেই প্রারম্ভিক যাত্রা থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারি, আমরা কখনোই দারিদ্র্য থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাইনি। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ আমলে আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, যে বাস্তবতা দেখেছি এবং যে পরিসংখ্যান তারা দাঁড় করিয়েছিল, তা বিবেচনায় নিলে প্রশ্ন জাগে, আজও কেন শাহজাহান মিয়াদের না খেয়ে থাকতে হয়?

শাহজাহান মিয়ার না খেয়ে থাকা এবং আওয়ামী লীগের মিথ্যা বুলির রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের অর্থনীতির দুটি তত্ত্বের ওপর আলোকপাত করতে হবে। অমর্ত্য সেনের ‘পোভার্টি অ্যান্ড ফেমিন্স’ গ্রন্থে বর্ণিত ‘অধিকারতত্ত্ব’ (এনটাইটেলমেন্ট থিওরি) অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষ খাদ্যের অভাবে নয়, বরং মানুষের তা কেনার সামর্থ্যের অভাবে ঘটে। বাজারে চাল ছিল, কিন্তু দিনমজুরের হাতে তা কেনার মতো আয় ছিল না। এই শিক্ষা আজও দারিদ্র্য বিমোচনের মূল সূত্র : ক্ষুধা মেটাতে হলে মানুষের হাতে ক্রয়ক্ষমতা পৌঁছাতে হবে, আর রাষ্ট্রকে হতে হবে সেই মানুষের কাছে দায়বদ্ধ।

কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে, তার একটি উদাহরণ হলো—বিশ্বব্যাংকের ক্যালেন্ডারের বছরভিত্তিক তথ্য। ওই তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৪০ শতাংশ, যা ১৯৮৭ সালের পর থেকে ওই ধারাবাহিক সিরিজে সর্বোচ্চ হার। সে সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও মূল্যস্ফীতি উঁচু ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনে ওই অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ১০.০৩ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, উন্নয়নের ফুলঝুরির আড়ালে বাংলাদেশের মানুষ কখন থেকে দারিদ্র্যের কবলে পড়তে শুরু করেছে।

তবে একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, ২০০০ সালে থাকা প্রায় ৪৯ শতাংশ দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে নেমে এসেছিল ১৮.৭ শতাংশে। এই অর্জন আমাদের কৃষক, পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী ভাইবোন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঘামের ফসল। কিন্তু ঠিক এর পরই ছবিটা উল্টে যায়। ২০২২ সালের পর বাজারের হিসাব আর মানুষের পকেটের হিসাব আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এর ফলে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৩ সালে ১৯.২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ২০.৫ শতাংশে উঠেছে। সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। একজন রিকশাচালক, একজন দিনমজুর কিংবা একজন গৃহশ্রমিক নারী প্রতিদিন যে বাস্তবতা অনুভব করেছেন, তা এই পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি নির্মম।

কিন্তু কেন? কেন দীর্ঘ দেড় দশকের একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার, যে নিজেকে উন্নয়নের কাণ্ডারি বলে বুলি আওড়াত, এই সংকট ঠেকাতে পারেনি? আমার বিশ্বাস, উত্তরটি রয়েছে সেই ফ্যাসিবাদী শাসনের চরিত্রে।

ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস রবিনসন তাঁদের ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্রে ক্ষমতা কোনো জবাবদিহির আওতায় থাকে না, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে কাজ করে এবং উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে না পৌঁছে ওপরের স্তরে জমা হয়। বাংলাদেশে সেই তত্ত্বই নির্মমভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। কমিটি ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০.৬ শতাংশ। যে অর্থ কৃষকের সেচে, শ্রমিকের কর্মসংস্থানে এবং শিশুর পুষ্টিতে ব্যয় হতে পারত, তা ঋণের নামে দেশের বাইরে চলে গেছে। দরিদ্র মানুষের পকেট থেকে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার পাশে এই পাচারের অঙ্ক রাখলেই বোঝা যায়, দারিদ্র্য কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্নীতির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে নিপীড়ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে যা ঘটেছে, তা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে। অমর্ত্য সেন তাঁর ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি দারিদ্র্যবিরোধী লড়াইয়ের অপরিহার্য শর্ত। কারণ, যে সরকারকে জনগণের ভোটের কাছে জবাব দিতে হয় না, তার কানে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ পৌঁছায় না। যে শাসক নিজের সন্তানদের বুকে গুলি চালাতে দ্বিধা করে না, তার কাছে দারিদ্র্য বিমোচনের আশা করা বৃথা। ফ্যাসিবাদী কাঠামোর শিকড় এখানেই। ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ, দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষকতা এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি অবজ্ঞা, এই তিনের সমন্বয়ে যে ব্যবস্থা দাঁড়ায়, সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন হয় না; দারিদ্র্য কেবল ঢাকা পড়ে।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সেই অবিচারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। বিএনপি ভূমিধস বিজয় অর্জন করে এবং তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ করেন। এই জনরায় আমাদের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়, এক গুরুদায়িত্ব। আর বিএনপি সেই দায়িত্ব পালনের জন্য ইতিহাসগতভাবেই প্রস্তুত। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বিএনপির রাজনীতির গোড়ার কথা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে স্বনির্ভরতার স্লোগান নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন এবং নিজের হাতে কোদাল ধরে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। তাঁর শাসনামলের প্রথম পর্যায়ে ৬৭৫ মাইলেরও বেশি দীর্ঘ ১৯৩টি খাল খনন ও পুনঃখনন করা হয়েছিল। আজ তাঁরই পুত্র, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সেই ঐতিহ্যকে নতুন যুগের উপযোগী করে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর সরকারের দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সরল অথচ গভীর উপলব্ধি, যা তিনি সংসদে ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘উন্নয়নের মূল একক ব্যক্তি নয়, পরিবার।’

এই দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ ফ্যামিলি কার্ড। সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায়, ১০ মার্চ, প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীর হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হয়, যাঁদের প্রত্যেকে মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা পাচ্ছেন। কার্ডটি চিপ, কিউআর কোড ও এনএফসি প্রযুক্তিযুক্ত এবং একটি কার্ডে পরিবারের পাঁচজন পর্যন্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। নারীর হাতেই কেন? এর পেছনে রয়েছে বিশ্বজোড়া গবেষণার ভিত্তি। এস্থার ডুফলোর দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক গবেষণা দেখিয়েছে, পরিবারের নারীর হাতে নগদ অর্থ গেলে তা শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষায় বেশি ব্যয় হয়। ব্যানার্জি ও ডুফলো তাঁদের ‘পুওর ইকনোমিকস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, নগদ সহায়তা পেলে দরিদ্র মানুষ অলস হয়ে যান না, বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ ও ছোট উদ্যোগে বিনিয়োগ করেন। কেনিয়ায় ইগার ও তাঁর সহগবেষকদের একটি বৃহৎ পরীক্ষায় (ইকনোমেট্রিকা ২০২২) দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকায় হস্তান্তরের প্রতি এক ডলার স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রায় আড়াই ডলারের কর্মকাণ্ড তৈরি করেছে, অথচ উল্লেখযোগ্য মূল্যস্ফীতি ঘটেনি। মেক্সিকোর প্রোগ্রেসা এবং ব্রাজিলের বলসা ফামিলিয়ার অভিজ্ঞতাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট করেছেন, এই কর্মসূচির জন্য টাকা ছাপানো হবে না।

কর্মসূচির নকশাতেও সরকারের দূরদর্শিতা স্পষ্ট। সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, কার্ডটিকে একটি ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে যাওয়া পরিবার তালিকা থেকে বাদ যাবে এবং নতুন যোগ্য পরিবার যুক্ত হবে। অর্থাৎ এটি এমন এক জীবন্ত ব্যবস্থা, যা অযোগ্যদের হাতে সুবিধা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা কমায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪১ লাখ উপকারভোগীকে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে, আর সরকার আগামী চার বছরে প্রায় ১.৬ কোটি পরিবারে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে। এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে রেপিডের একটি সিমুলেশন গবেষণা বলছে, ২০২২ সালের জরিপের ভিত্তিতে সব দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা পেলে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ থেকে ১১.৩ শতাংশে এবং অতিদারিদ্র্যের হার ৫.৬ থেকে ২.২ শতাংশে নামতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ১.২৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। এই পরিকল্পনার পেছনে বাজেটের সমর্থনও বিশাল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৩.৯ শতাংশ বেশি।

কিন্তু বিএনপির দারিদ্র্যবিরোধী কৌশল শুধু একটি কার্ডে সীমিত নয়; এটি গ্রামবাংলার মাটি থেকে শহরের ফুটপাত পর্যন্ত বিস্তৃত এক সমন্বিত পরিকল্পনা। কৃষকের জন্য রয়েছে কৃষক কার্ড, যার আওতায় ৪২.৫ লাখ কৃষক বছরে দুই হাজার ৫০০ টাকা করে পাবেন। এ ছাড়া সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করেছে। সবচেয়ে প্রতীকী ও কার্যকর উদ্যোগ বিএনপির খাল খনন কর্মসূচি। ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী দিনাজপুরের কাহারোল থেকে ৫৪ জেলায় একযোগে দেশব্যাপী খাল ও জলাধার খনন-পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচের উন্নয়ন ও কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, এর অংশ হিসেবে জুন পর্যন্ত এক হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন কিংবা পুনঃখননের পরিকল্পনা ছিল। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে দুটি লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে : কৃষির অবকাঠামো মজবুত হচ্ছে এবং গ্রামের মানুষ কাজ পাচ্ছেন। বিশেষত, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায়ও খাল পুনঃখনন কার্যক্রম চলছে।

দারিদ্র্যের বড় একটি কারণ অসুস্থতা। একটি দুরারোগ্য রোগ একটি পরিবারকে রাতারাতি সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় একে ‘ক্যাটাস্ট্রফিক স্বাস্থ্যব্যয়’ বলা হয়, যা প্রতিবছর অসংখ্য পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এই সংকট মোকাবেলায় সরকার ই-হেলথ কার্ড উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, যা বর্তমানে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের আওতায় খুলনা জেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.০১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য চিকিৎসা সহায়তার সর্বোচ্চ পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৬৫ হাজার রোগীকে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার জন্য ৬৫০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।

ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি সম্মান ও তাঁদের জীবিকার নিরাপত্তাও এই সুরক্ষা কাঠামোর অংশ। ১৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ সব ধর্মের উপাসনালয়ের সেবকদের জন্য মাসিক সম্মানী কর্মসূচি চালু করেছেন। এই কর্মসূচিতে ইমামরা মাসে পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিনরা তিন হাজার টাকা এবং খাদেমরা দুই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। মসজিদের পাশাপাশি মন্দিরের পুরোহিত ও সেবায়েত, বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু এবং গির্জার যাজকরাও এর আওতায় আছেন। সরকার জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন এই ভাতা পাবেন। এ জন্য এক হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে এবং আগামী চার বছরে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট পাটনাম যাকে ‘সামাজিক পুঁজি’ বলেছেন, মসজিদ, মন্দির ও গির্জাকেন্দ্রিক সেই তৃণমূল সম্প্রদায়ের মেরুদণ্ড—যাঁরা ধরে রাখেন, তাঁদের সম্মান ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সামাজিক বন্ধন ও দারিদ্র্য মোকাবেলার সক্ষমতা, উভয় ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ।

এর পাশাপাশি বিদ্যমান সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকেও সরকার জোরদার করছে। বয়স্ক ভাতা ৬৫০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে এবং উপকারভোগীর সংখ্যা আরো এক লাখ বাড়িয়ে ৬২ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। বিধবা ভাতাতেও একই ধরনের বৃদ্ধি ঘটছে, আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৪.৫ লাখ মানুষ মাসে ৯০০ টাকা ভাতা পান। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণদের জন্য ট্রেনে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগও প্রস্তাব করা হয়েছে। কর্মহীনদের জন্য চালু হচ্ছে নতুন বেকার ভাতা। ১৫ হাজার বেকার শ্রমিক সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাবেন। সব মিলিয়ে বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, ছয়টি নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নতুন উপকারভোগীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই চিত্র দেখলে বোঝা যায়, কৃষক থেকে নারী, বয়স্ক থেকে বেকার তরুণ, রোগী থেকে ধর্মীয় সেবক, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য এই সরকারের কিছু না কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং আজকের দিনে রিকশাচালক শাহজাহান মিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, দারিদ্র্য কমে তখনই, যখন রাষ্ট্র মানুষের আয়ের নিরাপত্তা দেয় এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার জবাবদিহির সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছিল, দুর্নীতি ও লুটপাটের মধ্য দিয়ে সম্পদ বিদেশে পাচার করেছিল, আর তার মূল্য দিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি এর বিপরীত। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার প্রথম দিন থেকেই দারিদ্র্য বিমোচনকে শাসনের কেন্দ্রে রেখেছেন। সরকার গঠনের মাত্র ২১ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড চালু হয়েছে। কৃষক কার্ড, খাল খনন, ই-হেলথ কার্ড, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা বৃদ্ধি, বেকার ভাতা এবং ইমাম-সেবায়েতদের সম্মানীর মতো কর্মসূচি একের পর এক বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এই দ্রুততা ও পরিকল্পনা প্রমাণ করে, বিএনপি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয় না, তা পূরণ করার সক্ষমতা ও সদিচ্ছাও রাখে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেসব কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান ও কৃষির উন্নয়নের পথ দেখিয়েছিলেন, তারেক রহমান সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল তালিকা ও পরিবারভিত্তিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে আরো কার্যকর করেছেন। এটি বিএনপির দীর্ঘদিনের দারিদ্র্যবিরোধী রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। এ পর্যন্ত সরকারের উদ্যোগ, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের গতি দেখে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, বিএনপি সরকার একটি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে বদ্ধপরিকর। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসে তাই আমাদের আহবান স্পষ্ট : আসুন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই সরকারের পাশে দাঁড়াই, কর্মসূচির সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছানোর কাজে অংশ নিই এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এই যাত্রায় সবাই একসঙ্গে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলি।

লেখক : অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ এবং সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights