এখনো বন্ধুর বাঁশি বাজে কানে কানে

ঢাকাই চলচ্চিত্রের তারকা গড়ার কারিগর খ্যাত চিত্রনির্মাতা এহতেশাম ১৯৯১ সালে দর্শকদের উপহার দিলেন একজোড়া নতুন মুখ। তাঁরা হলেন শাবনাজ ও নাঈম। তাঁদের নিয়ে নির্মাণ করলেন ‘চাঁদনী’ চলচ্চিত্রটি। এই নির্মাতা এর আগে উপহার দেন শবনম, রহমান, নাদিম, শাবানা, শাবনূর, সুভাষ দত্তসহ অসংখ্য জনপ্রিয় তারকা। এক সোনালি বিকালে কথা হয় নাঈম-শাবনাজ জুটির সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতার কথা তুলে ধরেছেন-আলাউদ্দীন মাজিদ

বাবার পরিবর্তে নায়ক হলাম আমি : নাঈম

আমাদের নবাব পরিবারের সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা এহতেশামের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত মধুর। আমার বাবা খাজা মুরাদকে নায়ক করে ছবি নির্মাণের অবারিত ইচ্ছা ছিল এহতেশাম সাহেবের। এতে পারিবারিক বাধা না থাকলেও আমার মা আসিয়া পন্নীর আপত্তি ছিল। আর এ আপত্তির কারণেই বাবা আর রুপালি পর্দা আলোকিত করতে পারলেন না। এরপর সময় গড়িয়েছে অনেক। আমি তখন সদ্য কিশোর বলা যায়। পড়ালেখা নিয়ে আকাশপাতাল ব্যস্ততা আমার। আমাকে নায়ক করার জন্য একদিন এহতেশাম সাহেব এসে বাবাকে ধরে বসলেন। বাবা কোনো আপত্তি করলেন না। আমাকে নায়ক করে শুরু হলো ‘চাঁদনী’ নির্মাণের মিশন। তার পরের গল্প সবারই জানা। বলতে বলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল নাঈমের ঠোঁটের কোণে।

আমার জিদ চেপে গেল : শাবনাজ

আমাকে যখন নায়িকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তখন নির্মাতা এহতেশাম সাহেবকে নাঈম বলেছিলেন … না, না এই মেয়েকে কোনোভাবেই নায়িকা করা যাবে না। তাঁর সঙ্গে অভিনয় করব না। ও বলেছিল আমি নাকি শুকনো, মাথায় চিটচিটে তেল দেওয়া আর গোল চশমা পরা একটি কি¤ভূতকিমাকার একটি মেয়ে। আমার মতো এমন মেয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই জুটি বাঁধবে না ও। এ কথাটি পরে এহতেশাম সাহেবের কাছ থেকে শুনে আমার মধ্যে প্রচণ্ড জিদ চেপে যায়। আমি বললাম দেখি ও কীভাবে আমাকে নায়িকা হতে না দেয়। আমি নায়িকা হয়েই ছাড়ব। শেষ পর্যন্ত আমিই জয়ী হলাম। শাবনাজের অভিযোগের তীরে বিদ্ধ নাঈম হেসে কুটি কুটি।

যেভাবে চাঁদনী হলাম : শাবনাজ

একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে এহতেশাম সাহেব আমাকে দেখেন। তাঁর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও একসময় এহতেশাম সাহেবের কাছে পাঠানো হয়। ভিডিওতে আমাকে দেখে বাবাকে তিনি বললেন আমাকে ‘চাঁদনী’ ছবির নায়িকা করতে চান। বাবা যেহেতু মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই তিনি না করলেন না। যদিও দাদা-দাদি চাননি কিন্তু বাবা বললেন আমি যদি এ অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারি আমার মেয়ে কেন নয়। ব্যাস, বাবার উৎসাহে ‘চাঁদনী’ হয়ে গেলাম।

পর্দা জুটি থেকে আমাদের জীবন জুটির গল্প : নাঈম

পর্দা থেকে জীবন জুটি হওয়াটা কীভাবে সম্ভব হলো? এমন প্রশ্নে এখনো কিছুটা লজ্জার আভা ফুটে ওঠে এ সুখী দম্পতির চোখেমুখে। নাঈম স্মিত হেসে বললেন, এরই মধ্যে আমরা জুটি বেঁধে অনেক ছবিতে কাজ করে ফেলেছি। ভাবলাম আমাদের জুটির রসায়ন পাকা করতে আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক আরও উন্নত করা দরকার। ১৯৯৪ সাল। সিলেটে এহতেশাম সাহেবের ‘চোখে চোখে’ ছবির শুটিংয়ে গেছি। যে বাংলোতে আমরা উঠেছি সেই বাংলোর জিএম ছবির টিমকে নিমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে শাবনাজের বাবাসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। আয়োজনের এক ফাঁকে আমি শাবনাজকে ডেকে বাইরে নিয়ে যাই। নিঃসংকোচে তাঁকে মনের কথা খুলে বলি। শাবনাজের কাছে জানতে চাইলাম জবাবে আপনি কী বলেছিলেন।

লজ্জা জড়ানো হাসিতে তাঁর কথায়-ওর কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পাওয়াটা আমার জন্য কোনো সারপ্রাইজ ছিল না। আমিও মনে মনে ওকে ফিল করতাম। একটানা তিন বছর একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমাদের মধ্যে একটা গভীর বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। এ সম্পর্ক যদি দুজনের মধ্যে নিবিড় আর নির্ভরযোগ্য করা যায় তাতে ক্ষতি কি? তাই তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হতে কার্পণ্য করিনি। ১৯৯৪ সালেই গাঁটছড়া বাঁধলাম। তার পরের ইতিহাস তো সবারই জানা। এখনো বন্ধুর বাঁশি বাজে আমাদের কানে কানে… ও হ্যাঁ, নাঈম কিন্তু ভালো বাঁশি বাজাতে পারে। সব বাদ্যযন্ত্রেই রয়েছে তাঁর দক্ষতা। শাবনাজের এ কথার প্রমাণ পেলাম তাঁদের ড্রইং রুমে পরম যত্নে সাজিয়ে রাখা একগুচ্ছ বাঁশের বাঁশি দেখে।

চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়ালাম কেন : নাঈম

এমন প্রশ্নে দুজনের চোখেমুখে বিষাদের ছায়া বহু দূর থেকেও আঁচ করা যায়। অনেকটা উদাস হয়ে ওঠা নাঈম বলেন, ১৯৯৪ সালটা আমার জীবনের জন্য একটি কষ্টের বছর। এ বছর প্রথম প্রযোজনায় এলাম। ‘আগুন জ্বলে’ শিরোনামের একটি ছবি নির্মাণ করলাম। ছবিটি সফলতার মুখ দেখল না। চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হলাম। এর পরই প্রিয় বাবাকে হারালাম। এ দুই ঘটনা, বিশেষ করে বাবাকে হারানোর কষ্ট আমাকে চলচ্চিত্রবিমুখ করে দেয়…বলতে বলতে নাঈমের চোখের কোণে বেদনার অশ্রু জমে উঠল।

বাবার ছায়া ছিলাম : নাঈম

নিজেকে কিছুটা সামলে উদাস কণ্ঠে নাঈম বলে চললেন-বাবাকে হারানোর যন্ত্রণাটা এখনো বুকে বড় বেশি বাজে। আমি ছিলাম বাবার ছায়া। আমাকে ছাড়া বাবা, বাবাকে ছাড়া আমি ছিল অকল্পনীয়। এমন সম্পর্ক আর কারও আছে বলে আমার জানা নেই। সেই প্রিয় বাবা যখন হঠাৎ আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন তখন নিজেই নিজের জীবনের প্রতি মায়া হারিয়ে ফেললাম। হয়তো সেই শোকে আমিও মারা যেতাম। কিন্তু শাবনাজের অবর্ণনীয় সান্ত্বনা আমার বেঁচে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়াল। ওর সাপোর্টের কারণে আর বাবার স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এখনো বেঁচে আছি আমি।

দুজনের পরিবারের গল্প : শাবনাজ

জানেন আমাদের দুজনের পরিবারের মধ্যে অনেক মিল আছে। এই যেমন ধরুন-দুজনের নানার নাম প্রায় এক। ওর নানার নাম মেহেদী আলী খান পন্নী। আর আমার নানা হলেন খন্দকার আলী মেহেদী। নাঈমের বাবা হলেন খাজা মুরাদ। আমার বাবার নাম স ম হুমায়ন। আমার বাবা তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সঙ্গে গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। আমাদের বাড়ি বিক্রমপুর। নাঈমের নানাবাড়ি টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। করটিয়ার বিখ্যাত পন্নী পরিবারের মেয়ে আসিয়া পন্নী হলেন নাঈমের আম্মা। আর আমার আম্মুর নাম আঞ্জুমান নাহার। আমরা তিন বোন। ছোট বোন তাহমিনা সুলতানা মৌ টিভি নাটকে অভিনয় করে। আর ছোট বোন শাহনাজ সোনিয়া হাউস ওয়াইফ। নাঈমরা এক ভাই এক বোন। ওর বোন জিবা ইসলাম একজন ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফার। আমাদের দুই মেয়ে। নামিরা ও মাহাদিয়া। নামিরা টরেন্টোতে ইনভারমেন্ট ডিজাস্টার টেকনোলজি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা করছে। মাহাদিয়া এ লেভেল শেষ করবে। দুজনই পড়ালেখায় ভালো রেজাল্ট করায় ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়। বড় মেয়ে ভালো পেইন্টিং করে ও ফুটবল খেলে। বলতে পারেন আমরা নিখাদ একটি সুখী পরিবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights