আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রণক্ষেত্র রাজধানী তিরানা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল ইউরোপের দেশ আলবেনিয়া। রাজধানী তিরানার রাজপথ গত কয়েক দিন ধরে সম্পূর্ণ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ তুলে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, যা আলবেনিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

শনিবার টানা পঞ্চম দিনের মতো তিরানার কেন্দ্রে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ ঘটে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশ ছিল স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনকে রক্ষা করতে মোতায়েন থাকা দাঙ্গা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান ও বেপরোয়াভাবে টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এমনকি প্রথমবারের মতো রাবার বুলেট ব্যবহারেরও খবর পাওয়া গেছে। শহরের প্রধান সড়কে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া এবং পেট্রলবোমা বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে গোটা এলাকা স্তব্ধ হয়ে যায়।

দুপুরের দিকে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দু সরে যায় প্রধান সড়কে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রী ইদি রামার কার্যালয়ের সামনে। আগের দিনগুলোর তুলনায় সেখানে জনস্রোত বহুগুণ বেড়ে যায়। ক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ইট ও আতশবাজি ছুড়তে শুরু করে। জবাবে পুলিশও একের পর এক টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। বাতাসে উড়তে থাকে কালো ধোঁয়া, আর চারদিকে অ্যাম্বুলেন্স ও পুলিশের সাইরেনের শব্দে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্ধ্যার দিকে নামানো হয় পুলিশের বিশেষ বাহিনীকে। সংঘর্ষে দুই পক্ষেই বহু মানুষ আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চার্জশিট গঠন করা হয়েছে এবং শত শত আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ভাঙাচোরা কাচ ও পোড়া ধ্বংসাবশেষে তিরানার কেন্দ্রস্থল এখন এক যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের চেহারা নিয়েছে।

১৯ বছর বয়সী এক তরুণ ও মেডিকেলশিক্ষার্থী জর্জ, যিনি পড়াশোনার খরচ চালাতে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন, তিনি জানান যে তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বর্তমান সরকার তা চায়নি। তাই তারা বাধ্য হয়ে এই সহিংস আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন।

১৭ বছরের আরেক শিক্ষার্থী ক্লেয়া বলেন, সব শিক্ষার্থীরা তাদের ক্লাসের পড়াশোনা বয়কট করে রাজপথে নেমেছেন কেবল তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দেশের পুরো রাজনৈতিক শ্রেণিটিই দুর্নীতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের একটি অংশ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আগামী এক বছরের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও তদারকি সরকার গঠনের দাবি তুলেছেন, যারা নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে পারে।

এদিকে, ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা এই বিক্ষোভের জন্য সরাসরি বিরোধী দল এবং বিদেশি শক্তির ইন্ধনকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, আলবেনিয়ার ইইউ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের অগ্রগতিকে ব্যাহত করার জন্যই এই ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ফলেই প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিজের সাফল্যের ফাঁদে পড়েছেন। দেশের বিশেষ প্রসিকিউশন সার্ভিসের চলমান দুর্নীতিবিরোধী একাধিক তদন্ত এবং সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর গদি কাঁপিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আলবেনিয়া।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights