ইতিহাসের সমৃদ্ধ ভান্ডার, তবু শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটাই অচেনা চবি জাদুঘর
ছোট্ট একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই কাচের বাক্সে সাজানো নিদর্শনগুলো যেন দর্শনার্থীকে নিয়ে যায় কয়েক শ কিংবা কয়েক হাজার বছর আগের সময়ে।
প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, টেরাকোটা, পাণ্ডুলিপি, লোকশিল্প থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মারক। সব মিলিয়ে সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়(চবি) জাদুঘর। তবে এমন ঐতিহাসিক ও গবেষণামূলক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি এখনো মূলত একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবেই পরিচিত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশের সবুজ-নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন। জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে পাঁচটি গ্যালারি- প্রাগৈতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ব, প্রাচীন ভাস্কর্য, ইসলামিক শিল্পকলা, লোকশিল্প ও সমকালীন শিল্পকলা। প্রতিটি গ্যালারিতে ইতিহাসের আলাদা আলাদা অধ্যায়ের নিদর্শন রাখা হয়েছে।
মুঘল আমলের কামান ‘সার জং’
জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ মুঘল আমলের কামান ‘সার জং’। সম্রাট শাহজাহানের আমলে ব্যবহৃত প্রায় ১৯৭ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এই কামানটি সূক্ষ্ম কারুকাজের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা, শিলালিপি, হাতে লেখা পবিত্র কোরআন, টেরাকোটা ফলক, ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, লোকজ সামগ্রী, আদিবাসী অলংকার এবং মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও পোস্টার।
জাদুঘর ঘুরতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরাফাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর পরিদর্শন করে খুব ভালো লেগেছে। ইতিহাসের অনেক পুরোনো নিদর্শন এখানে স্বচক্ষে দেখতে পেরেছি। বইয়ে যা পড়ি, এখানে এসে তা আরও সহজে বোঝা যায়।’
আরেক শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম বলেন, ‘চবি জাদুঘর যেন জীবন্ত ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নানা নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত আছে। আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।’
২৪টি নিদর্শন থেকে যাত্রা
জাদুঘর সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে ইতিহাস বিভাগের সংগ্রহে থাকা মাত্র ২৪টি প্রত্ননিদর্শন দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ড. এ আর মল্লিক ও ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিমের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্নসম্পদ সংগ্রহ করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১৪ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়।
জাদুঘরে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি প্রত্নসম্পদ সংরক্ষিত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও অন্য একটি তথ্যে সংগ্রহের সংখ্যা প্রায় আট হাজার বলা হয়েছে। এসব সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্ম, সুলতানি ও মুঘল আমলের মুদ্রা, পাথর ও ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য, টেরাকোটা ফলক, লোকশিল্প, মুক্তিযুদ্ধের দলিল এবং আদিবাসী অলংকার। নাসিরাবাদ পাহাড় থেকে পাওয়া টারশিয়ারি যুগের মাছের জীবাশ্মকে জাদুঘরের প্রাচীনতম সংগ্রহগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র
শুধু দর্শনার্থীদের জন্য নয়, গবেষকদের কাছেও জাদুঘরটির গুরুত্ব রয়েছে। নিচতলায় রয়েছে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ গ্রন্থাগার। সেখানে বাংলা, সংস্কৃত, ফারসি, আরবি ও পালি ভাষার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। রয়েছে গবেষকদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষ। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা নিয়মিত এই গ্রন্থাগার ব্যবহার করেন।
জাদুঘরের সংগ্রহে মুদ্রাতত্ত্ব, ভাস্কর্যশিল্প, স্থাপত্য ও শিলালিপিবিষয়ক বিভিন্ন নিদর্শনের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারকও রয়েছে। ফলে ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, শিল্পকলা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে জাদুঘরটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ করতে পারে।
জাদুঘরের সুপারভাইজার আলী হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর বাংলাদেশের একমাত্র একাডেমিক জাদুঘর। এখানে পাঁচটি গ্যালারিতে বিভিন্ন যুগের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও গবেষক নিয়মিত এখানে আসেন। ভবিষ্যতে জাদুঘরটিকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের কাছে কেন সীমিত পরিচিতি
এত সমৃদ্ধ সংগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে জাদুঘরটির ব্যবহার মূলত ঘোরাঘুরি ও দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ এসব নিদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ জীবন ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকশিল্প থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবন ও গ্রামবাংলার আবহ সম্পর্কে এখানে জানতে পারি। তবে আমাদের পুরোনো নিদর্শনগুলো কাজে লাগিয়ে কীভাবে ভবিষ্যৎ নির্ণয় করা যায়, সে বিষয়েও যেন আমরা জানতে পারি—এ ধরনের কার্যক্রম আরও থাকা দরকার।’
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে জাদুঘরকেন্দ্রিক শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোরশেদুল আলম বলেন, ‘আমাদের এই জাদুঘরকে যদি আরও সুন্দর ও আধুনিকায়ন করা যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেয়, তাহলে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য এটি অত্যন্ত দরকারি একটি প্রতিষ্ঠান হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।’
প্রায় ছয় দশকের পথচলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর কেবল পুরোনো নিদর্শন সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে সেই সংগ্রহশালাকে শিক্ষার্থী ও গবেষণার আরও কাছাকাছি আনতে প্রয়োজন নিয়মিত কার্যক্রম, আধুনিকায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এর ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ।
