তিন বড় বাজির সবক’টিতেই হারলেন যুবরাজ?

অনলাইন ডেস্ক

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বর্তমানে তার শাসনকালের অন্যতম কঠিন সময় পার করছেন। ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে ভরসা করার যে তিনটি বড় ঝুঁকি তিনি নিয়েছিলেন, তা একই সময়ে এসে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জোড়া সংকটের মুখে পড়ে সৌদি যুবরাজ এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখান থেকে সহজ কোনো বের হওয়ার পথ তাঁর সামনে খোলা নেই। সাময়িকীটি গত বছরটিকে যুবরাজের জন্য এক চরম বিপর্যয়কর সময় হিসেবে বর্ণনা করেছে। পরিস্থিতি কতটা বেগতিক, তা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় তাদের বহুল প্রচারিত ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বাতিল করার ঘটনা থেকে।

ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকি হুতি সামরিকভাবে পরাজিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সৌদি আরব। অথচ রিয়াদ আশা করেছিল ২০২২ সালে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি হয়তো স্থায়ী হবে। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর সেই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এর জবাবে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীও সৌদি আরবের ভূখণ্ডে পাল্টা জোরালো হামলা শুরু করে। সৌদি প্রিন্সের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো ইকোনমিস্টকে জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তাঁর সামনে যেসব বিকল্প খোলা রয়েছে, তার প্রতিটিই চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও খেসারতপূর্ণ। তিনি চাইলে ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী ভূখণ্ডে পদাতিক সৈন্য পাঠিয়ে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত করতে পারেন কিংবা অকার্যকর প্রমাণিত হওয়া আকাশপথে বিমান হামলা চালিয়ে যেতে পারেন। অন্যথায়, হুতি শাসনকে আরও শক্তভাবে মেনে নিয়ে একটি চুক্তিতে সই করতে পারেন।

দীর্ঘ মেয়াদে এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে তা মোহাম্মদ বিন সালমানের বহু আকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এমনিতেই তার পরিকল্পনাগুলো ২০২৬ সালের আগেই হোঁচট খেতে শুরু করেছিল। সরকারের ওপর সৃষ্টি হওয়া চরম আর্থিক চাপের কারণে ইতিমধ্যে কয়েকটি মেগা প্রকল্প স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। জীবনযাত্রার ব্যয় বা মূল্যস্ফীতি যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষের বেতন বাড়েনি। বার্ষিক প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমানে ক্রাউন প্রিন্সের নির্ধারিত ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের তিন ভাগের এক ভাগেও পৌঁছায়নি। যেখানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এক বছর আগে পূর্বাভাস দিয়েছিল যে ২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতি ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে, সেখানে সংস্থাটি এখন ৩.৩ শতাংশ সংকোচনের আশঙ্কা করছে।

দ্য ইকোনোমিস্টের মতে, ২০২৭ সালে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উত্তরণ পুরোপুরি নির্ভর করছে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তির ওপর, যা আবার সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী। রিয়াদ ভেবেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সেজন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অংকের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। ট্রাম্প পরিবারের সাথে সরাসরি ব্যবসায়িক চুক্তিও করা হয়েছিল; ট্রাম্পের মালিকানাধীন গলফ কোর্সে সৌদি অর্থায়নে টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয় এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের তহবিলে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু এত কিছু করেও ট্রাম্পকে একটি বিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত রাখা যায়নি। রিয়াদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক সৌদি নাগরিক দ্য ইকোনোমিস্টকে বলেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে দীর্ঘ সময়ের জন্য কারও প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন না।

গত ১০ অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে ইয়েমেনিদের এক পাল্টা হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর থেকে মোহাম্মদ বিন সালমানকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে কিছু পশ্চিমা বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে, এই অভূতপূর্ব সংকট কি যুবরাজের একচ্ছত্র ক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলবে কিনা। অবশ্য রিয়াদের কূটনৈতিক মহল এই ধরনের মূল্যায়নকে অতিমূল্যায়িত বলে মনে করছেন। সেখানকার এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানান, আজ থেকে সাত বা আট বছর আগে মোহাম্মদ বিন সালমান এর চেয়েও অনেক বেশি কঠিন পরিস্থিতিতে ছিলেন।

তবে দ্য ইকোনোমিস্ট যুক্তি দিয়ে বলেছে, বর্তমান সময়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ক্ষমতা গ্রহণের প্রাথমিক বছরগুলোতে তিনি যেসব সমস্যায় পড়েছিলেন, তার বেশিরভাগই ছিল নিজস্ব সিদ্ধান্তের ফসল এবং ফলে সেগুলো সমাধান করাও সহজ ছিল। ২০২১ সালের মধ্যেই তিনি তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বাস্তবসম্মত ধারায় নিয়ে এসেছিলেন; যেমন কাতারের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা এবং সানার সাথে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া, যে পরিবর্তনের প্রশংসায় বাইডেন প্রশাসনও বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর না বাড়াতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ রিয়াদ সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ভয় পাচ্ছেন যে, ট্রাম্প যদি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পুনরায় বোমাবর্ষণ শুরু করেন, তবে বর্তমান সংঘাতের আবহে চারদিক থেকে সৌদি আরবের ওপর আক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনটির শেষ অংশে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ বিন সালমান তার শাসনের প্রথম দশকে প্রশংসনীয় অনেক পরিবর্তন আনলেও সৌদি রাষ্ট্রের মূল ভিতগুলো আসলে অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে। আজও দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে তেল রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল, সামরিক বাহিনীকে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেয়ে অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা রক্ষার উপযোগী করে রাখা হয়েছে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকেই একমাত্র অপরিহার্য মিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে রিয়াদের ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করার উদ্যোগ থেকে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য না থাকলে বিকল্প মিত্র খোঁজার চেষ্টা চলছে। যদিও এই রূপান্তর ঘটতে অনেক সময় লাগবে। সুতরাং প্রথম দশকে যা-ই হোক না কেন, মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনের দ্বিতীয় দশকের মূল পরীক্ষা হবে রাষ্ট্রের কেবল বাহ্যিক রূপ সাজানো নয় বরং এই মৌলিক ভিতগুলোকে সত্যিকার অর্থে বদলে দেওয়া।

সূত্র: আল মায়াদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights