বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম
অনলাইন ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দুই প্রধান সূচক ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ব্যারেলপ্রতি ২ ডলারের বেশি বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনের কোনও লক্ষণ না থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মজুত কমে যাওয়ায় বাজারে দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ১০টা ৪৮ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টা ৪৮ মিনিট) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ০৬ ডলার বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১১০ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১৩ ডলার বা ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছায়।
এর আগের কার্যদিবসে ব্রেন্টের দাম গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে, ডব্লিউটিআইয়ের দাম ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার খবরে আবার কিছুটা কমে আসে।
তবে বুধবার ইরানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশের পর বাজারে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সংশয়
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, নিজেদের রক্ষায় ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
অন্যদিকে, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ওপর অবরোধ আরোপ ও হামলার হুমকি দিয়ে অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে সংলাপের প্রত্যাশা করতে পারে না।
ইরানের এই বক্তব্যে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের মধ্যে তেহরানে বৈঠকে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই খবরের পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও বুধবার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য এবং রাশিয়া-ইউক্রেন- এই দুই সংঘাতই জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতির কোনও লক্ষণ না থাকায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কাটছে না।
পিভিএমের বিশ্লেষকেরা বলেন, বাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখা দুটি ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কোনওটিতেই উত্তেজনা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালির বাইরেও জাহাজে হামলার উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা। বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি জাহাজে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালির বাইরেও ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার পরিধি ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলার কার্যক্রম এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়। এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে।
সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার দাবি
এদিকে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সোমবার সৌদি আরবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইয়ানবুতে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা, শায়বাহ তেলক্ষেত্র এবং সৌদি আরবের রিয়াদ ও আভা বিমানবন্দর।
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার খবরও তেলের বাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটির তেল উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে এসব হামলায় সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও উৎপাদন কার্যক্রমে কী পরিমাণ প্রভাব পড়েছে, তা প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমেছে
তেলের দাম বৃদ্ধিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মজুত কমে যাওয়ার তথ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের দু’জন কর্মকর্তা মঙ্গলবার জানান, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিশোধনাগারগুলোর সঙ্গে কাজ করে জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তারা।
বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ১৬ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত ৪৯ লাখ ব্যারেল কমেছে। একই সময়ে পেট্রল ও অন্যান্য পাতিত জ্বালানির মজুতও কমেছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আনুষ্ঠানিক মজুতসংক্রান্ত প্রতিবেদন বুধবার গ্রিনিচ মান সময় বেলা ২টা ৩০ মিনিটে প্রকাশের কথা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে মজুত কমে যাওয়ার অর্থ হলো, বাজারে তেলের সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে এই পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় দাম বাড়ার চাপ আরও জোরালো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়তে পারে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কেনা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জ্বালানির ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং বলা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অচলাবস্থা, মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমে যাওয়ার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দিনগুলোতেও তেলের বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স, ডন নিউজ
