শীর্ষ ১০৩ কারবারির নিয়ন্ত্রণে ১১ থানায় মাদক কারবার

অনলাইন ডেস্ক

মারণনেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের কারবার পুরান ঢাকার ১১টি থানা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে হত্যা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ বেড়েছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক বিশেষ প্রতিবেদনে ১০৩ জন শীর্ষ মাদক কারবারির নাম উঠে এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযান চলাকালে অনেকে মাদক সেবন করছিল। ছিল মাদক কারবারিদের তৎপরতাও।

পুলিশ ও ডিএনসির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পুরান ঢাকায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এক হাজারের বেশি খুচরা মাদক বিক্রেতা। এরা ১১টি থানা এলাকায় মাদক কারবারে সম্পৃক্ত। তাদের অনেকে এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। অনেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে থেকে একই কাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল, কামরাঙ্গীর চর, সূত্রাপুর, চকবাজার, কদমতলী, শ্যামপুর ও ওয়ারী থানা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার চলছে। তারা সীমান্ত থেকে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য এনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এদের কারণে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। প্রকাশ্যে ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি—এমনকি মাদকের কারণে নারী নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে।

মাদকের বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় গত ১৭ অক্টোবর পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইনসংলগ্ন বস্তি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। এরপর গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।

পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর রেললাইন এলাকায় গতকাল অভিযান চালিয়েছে ডিএনসি। এ সময় দেয়ালের এক পাশে যখন ডিএনসির মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, অপর পাশে মাদক সেবন করছিলেন আশরাফ উদ্দীন নামের এক ব্যক্তি।

অভিযান পরিচালনাকারী ডিএনসির ঢাকা দক্ষিণের উপপরিদর্শক আসহাব উদ্দীন বলেন, বিকেল ৩টার দিকে অভিযানের সময় ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযানের সময় ইয়াবা, গাঁজা ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, গেণ্ডারিয়া ঘুণ্টিঘর এলাকায় অভিযান চালিয়ে আশরাফসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

গতকাল এসআরবি-৩ ও ডিএনসি সদস্যরা যখন গেণ্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেললাইন ক্রসিংয়ের পশ্চিম পাশে ঘুণ্টিঘর এলাকায় ছদ্মবেশে অভিযান শুরু করেন, তখন লোকজন দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। অভিযানের আগে সেখানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবন করতে দেখা যায়।

ডিএনসির ঢাকা দক্ষিণের উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, গ্রেপ্তারকৃত সবাই ভাসমান মাদকসেবী।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। মাদকসংক্রান্ত প্রায় ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন।

পুরান ঢাকার অলিগলিতে মাদক : সরেজমিনে গত দুই দিনে পুরান ঢাকার বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার বেড়েছে। রাতে এমনকি দিনেও অলিগলিতে মাদক বিক্রি করতে দেখা গেছে। গণকটুলি, সিটি কলোনি, গেণ্ডারিয়া, দয়াগঞ্জ মোড়, সূত্রাপুর, কদমতলী ও বাঘাবাড়ী এলাকায় মাদকের বিস্তার বেশি।

চকবাজার এলাকার বাসিন্দা মো. সোলাইমান বলেন, মাদকসেবীদের কারণে রাতে বের হতেও ভয় লাগে। তারা মাদক সেবন করে ছিনতাই করে। গত কয়েক দিনে এলাকায় বেশ কয়েকটি ছিনতাই হয়েছে।

পুরান ঢাকায় মাদক তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে জানিয়ে জালাল উদ্দীন নামের গেণ্ডারিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই এলাকার গলিগুলো মাদক কারবারিদের দখলে চলে যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তোয়াক্কা করে না তারা। তাদের কারণে এলাকায় ছিনতাই, নারী নির্যাতনসহ সব ধরনের অপরাধ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএএনসি) নিয়মিতভাবে ঢাকার আটটি ক্রাইম জোনে অভিযান চালাচ্ছে। এরপরও এসব এলাকায় মাদক কেনাবেচা থামছে না।

পুরান ঢাকায় সিআইডির তালিকায় থাকা মাদক কারবারি : সিআইডির তালিকা অনুযায়ী, কামরাঙ্গীর চরের মুনসুরবাগের আল হেরা কমিউনিটি সেন্টার এলাকার মো. মনির হোসেন, নয়াগাঁও মুড়ি ফ্যাক্টরি এলাকার হাসি ও খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি, মুসলিমবাগের মো. আরমান, বড়গ্রাম বাঁশতলা এলাকার মো. রমজান, কুমারঘাটের মো. ইয়াকুব আলীসহ আরো সাতজন। কোতোয়ালির কুমার নাগ, সাইফুল ইসলাম ওরফে সাগর, পারুলী রানী, মনির হোসেন ওরফে জনি, শম্ভুনাথ সুর, মো. মাইনুদ্দিন, আকরাম, আজিম, জীবন, সাজন প্রাসাদ ও জিতু চন্দ্র দাস।

চকবাজারে লিটন, চামারু রতন, আরমান হোসেন, তারা মিয়া ও শাহিন। লালবাগে রেজাউল, শাওন, মামুন মিয়া, স্বপন, তুহিন, রোজিনা আক্তার, টাইগার বাবুল ওরফে জাক্কি বাবু, সোহেল রানা, শাকিল, সাব্বির, মিজান, জুয়েল, পিসাস আরিফ, হায়দার হোসেন, রোজিনা বেগম, খলিল, মহিন, ইয়াছিন ও সজল।

বংশালের হীরা মিয়া, টেক্কা সুমন, বেরী রকি, কাওছার উদ্দিন মানিক, মনির হোসেন ওরফে কোরবান, বিলাল হোসেন শাওন, মুরগি আসিফ, বাপ্পি, সাগর বেপারী ও পারভেজ। ডেমরায় পিচ্চি হৃদয়, পেটু সোহেল, কান্দি সোহেল, সজীব, এমদাদুল হক, কামাল হোসেন, লিটন, রবিউল ইসলাম ভূঁইয়া, শিশির খান, রফিকুল ইসলাম সুমন, টুটুল আলম ভূঁইয়া, ইয়াকুব আলী, জাকির হোসেন ও সোহেল সাউদ।

শ্যামপুরে দিনার কাজল, মাসুম মিয়া, তারেক দস্তগীর, কসাই সোহেল, মিতু, মুন্না, হাসু গেম, সাদ্দাম হোসেন, শহিদ, আসিকুজ্জামান শাওন, ওয়াসিম, হাসান আলী লোকমান, শাহজাহান মিয়া ও হাবিবুর রহমান হাবু, ফেন্সি আরিফ, আবুল হাশেম, তপন মিয়া, শামীম হোসেন, ঈশান ও পাপ্পু ওরফে অপু। ওয়ারীতে লাবণী আক্তার, মেজবা আহম্মেদ জিকু, নাসিরুদ্দিন রনি, মিরাজ, আল আমিন ওরফে মানিক, রিপন মিয়া, শহীদুল ইসলাম মুক্তি, করিম ও মনি আক্তার। গেণ্ডারিয়ায় রহিমা, মনিরুল হক রবিন, পিচ্চি রানা, সজীব, বিকাশ ওরফে প্রকাশ ওরফে গোলাম মোস্তফা, আমির হোসেন, ইমরান ও লেংড়া মিলন।

কদমতলীতে জুলহাস, জাহাঙ্গীর আলম টিটু, বাপ্পারাজ, আবুল হোসেন কালু, সেকান্দার আলী, ইমন হোসেন পিয়াস, সাইদুর রহমান সজীব, কোরবান, ইকবাল, আরমান ওরফে জিতু, স্বপন ও কানা জব্বার। মুগদায় আনোয়ার হোসেন মিলাত, মঞ্জুর হোসেন নিজু, শহিদুল ইসলাম রিন্টু, রাকিবুজ্জামান রবিন, কাজল, মনির হোসেন, কেরকেরা মাসুদ, লতা আক্তার, সোহেল ও কেরকেরা রিপন। সবুজবাগের চম্পা, ময়না, শামীম, তানিয়া, মিলন, দিবা আক্তার, টেষ্টি বাবু, আশিকুর রহমান শান্ত ও খোরশেদ।

সিআইডির তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারিরাও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারে প্রভাব বিস্তার করে। এ এলাকার তালিকাভুক্তরা হলেন মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বুনিয়া সোহেল, গলা কাটা মনু, আনোয়ার হোসেন কালু, পিচ্চি রাজা, জাবেদ ওরফে টিপু, চুয়া সেলিম, জানে আলম ওরফে চোর জানু; রায়েরবাজারের চাপাই আরিফ, কৃষি মার্কেট ক্যাম্পের সারফু আরমান ও তাজ।

মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ মে থেকে শুরু হয় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান। অভিযানে এরই মধ্যে ৫২ লাখ পাঁচ হাজার ৩৩৪ পিস ইয়াবা, ৫,৬৮৯.৮৭ গ্রাম হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এ সময় পাঁচ হাজারের বেশি মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক গডফাদারদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। থানা এলাকায় নিয়মিত মাদক উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়। বেশির ভাগ অপরাধের মূলে এই চক্র।

ডিএনসি ও সিআইডি সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত এই শীর্ষ মাদক মাফিয়ারা মূলত পর্দার আড়ালে থেকে শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবার পাশাপাশি হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি করে তাদের বেশির ভাগ এখন কোটিপতি।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, দেশে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার মাদকের কারবার করে গডফাদাররা। দেশের ৭০ লাখ মাদকসেবী বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। সেই সঙ্গে মাদক নিরাময় কেন্দ্র, এনজিও, কার্যক্রম ও সরকারি কর্মকাণ্ডে আরো ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরুপ রতন চৌধুরী বলেন, মাদকাসক্তদের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। এর জন্য দায়ী মাদক গডফাদাররা। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights