ক্যান্টন ফেয়ারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ঢল, উম্মোচিত হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা

ইমরান এমি, গুয়াংঝু (চীন) থেকে ফিরে

প্রতি বছর চীনে শুরু হয় ‘চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ার’। চীনের গুয়াংদং প্রদেশের গুয়াংঝু শহরে গত ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে মেলাটির ১৪০তম আসর। ‘ক্যান্টন ফেয়ার’ নামে পরিচিত শতবর্ষী এই মেলা। মেলা ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি সেশনে হাজার হাজার আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা এবং নতুন উদ্যোক্তারা সরাসরি চীনা উৎপাদকদের কাছ থেকে পণ্য সোর্সিংয়ের জন্য গুয়াংঝুতে পাড়ি জমিয়েছেন। ১৯৫৭ সাল থেকে বৃহৎ এ বাণিজ্যমেলাটি চীনের গুয়াংঝু প্রাদেশিক সরকার এবং চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে আয়োজন করে আসছে।

সরেজমিনে ক্যান্টন ফেয়ারের প্রথম পর্ব ঘুরে দেখা গেছে, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃষি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স, নতুন জ্বালানির গাড়ি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়করণ ও বুদ্ধিমান উৎপাদন প্রযুক্তি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের আকর্ষণ করছে যন্ত্রচালিত রোবট, সৌরবিদ্যুৎ এবং হোম জিমের নানা পণ্য। মেলায় প্রতিটি ফ্লোরে দেখা মিলেছে বাংলাদেশের নানা অঞ্চল থেকে আসা উদ্যোক্তাদের। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর মেলায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, মেলায় এসে নতুন উদ্ভাবিত নানা পণ্য দেখেছি। এখান থেকে পছন্দের পণ্য বাছাই করে উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে, যা দেশে বসে কখনো সম্ভব নয়। এছাড়াও সরাসরি যোগাযোগের কারণে পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়।

মেলায় আসা চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আরিফুল ইসলাম রুবেল জানান, আমি তৃতীয়বারের মতো এই মেলায় এসেছি। যত দেখছি তত বেশি ব্যবসায়িক আইডিয়া পাচ্ছি। গত দুইবার এসে ঘুরেছি এবং উৎপাদকদের সঙ্গে কথা বলেছি। এবার এসেছি দেশে আমদানির (ইমপোর্ট) উদ্দেশ্যে। মূলত জিমের নানা আইটেম ও নতুন উদ্ভাবিত পণ্য নিয়ে আমার কাজ। আশা করছি মেলায় এসে ভালো কিছু করতে পারবো।

সিলেটের ব্যবসায়ী শ্রীধাম কর্মকার বলেন, আমার মূল ব্যবসা ইলেকট্রনিক পণ্য নিয়ে। প্রথমবারের মতো আমি মেলায় এসেছি। নানা পণ্যসামগ্রী ঘুরে দেখতেছি। পাশাপাশি উৎপাদকদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি।

জানা যায়, ২১৪টি দেশ ও অঞ্চলের তিন লাখেরও বেশি ক্রেতা এ মেলায় অংশ নিচ্ছেন, যা আগের সেশনের চেয়ে অনেক বেশি। মেলাটি তিনটি পর্বে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম পর্ব গত ১৫ অক্টোবর শুরু হয়ে ১৯ অক্টোবর শেষ হয়েছে। এই পর্বে গৃহস্থালি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি পণ্য, ইলেকট্রনিক-বৈদ্যুতিক পণ্য, আলোর সরঞ্জাম, নতুন শক্তির সংস্থান, নতুন উপাদানের রাসায়নিক পণ্য, হার্ডওয়্যার সরঞ্জাম, মেশিনিং মেশিনারি ও সরঞ্জাম, পাওয়ার-বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সাধারণ যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক যন্ত্রাংশ, ইন্টেলিজেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, কনস্ট্রাকশন মেশিনারি, এগ্রিকালচারাল মেশিনারি, নিউ এনার্জি ভেহিকেল এবং স্মার্ট মোবিলিটি, মোটরসাইকেল, সাইকেল, যানবাহনের খুচরা যন্ত্রাংশ ইত্যাদি প্রদর্শন করা হয়।

২৩ অক্টোবর থেকে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব, যা চলবে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত। এ পর্বে বিল্ডিং সাজসজ্জার সামগ্রী, স্যানিটারি ও বাথরুমের সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, রান্নাঘরের জিনিসপত্র, টেবিলওয়্যার, দৈনন্দিন ব্যবহারের সিরামিক, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, ঘড়ি ও অপটিক্যাল যন্ত্র, উপহারসামগ্রী, উৎসবের পণ্য, বাড়ির সজ্জা, শিল্প সিরামিক, কাচের পণ্য, বাগান বোনা বেত ও লোহার পণ্য, লোহা ও পাথরের সজ্জা এবং আউটডোর স্পা সুবিধা স্থান পাবে।

তৃতীয় পর্ব শুরু হবে ৩১ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। এ পর্বে ব্যক্তিগত যতেœর যন্ত্রপাতি, বাথরুম পণ্য, ওষুধ, স্বাস্থ্য পণ্য, চিকিৎসা ডিভাইস, পোষা প্রাণীর পণ্য, মাতৃত্ব ও শিশুর পণ্য, খেলনা, শিশুদের পোশাক, পুরুষ ও মহিলাদের পোশাক, খেলাধুলা ও নৈমিত্তিক পোশাক, অন্তর্বাস, পশম, চামড়া, পোশাকের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র, হোম টেক্সটাইল, টেক্সটাইলের কাঁচামাল ও কাপড়, কার্পেট এবং ট্যাপেস্ট্রি, জুতা, অফিস সরবরাহ ব্যাগ, স্যুটকেস, খেলাধুলা ও পর্যটনের অবসর পণ্য, খাদ্য এবং গ্রামীণ পুনরুজ্জীবন ক্যাটাগরির পণ্যগুলো প্রদর্শিত হবে।

বিশ্বের প্রায় সব স্বনামধন্য কোম্পানি তাদের নতুন উদ্ভাবনী পণ্যসহ সব আয়োজন মেলায় প্রদর্শন করে। নতুন উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি পুরোনো ক্রেতাদের সঙ্গে কোম্পানি তথা বিক্রেতাদের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই মেলা। প্রতি বছর বসন্ত ও শরৎকালে দুবার অনুষ্ঠিত হয় ‘চীন আমদানি ও রপ্তানি মেলা’। বিদেশি ক্রেতা ও দেশীয় উৎপাদকদের বৃহৎ অংশগ্রহণের কারণে এটি চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

এবারের প্রথম পর্বে বিদেশি ক্রেতাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের প্রতি আগ্রহ চীনের উৎপাদন শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে রোবট প্রযুক্তি, স্মার্ট যন্ত্রপাতি ও জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার মতো খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবন বিশ্ববাজারে নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights