৩-৪ ঘণ্টার মধ্যেই গানটি লেখা হলো
আলাউদ্দীন মাজিদ
‘মা মুনিয়া, মা মুনিয়া, মা মুনিয়া, মা মুনিয়া ও বিড়ালের ছানা গারে গান গানা, জারি সারি ভাটিয়ালি যা খুশিতে নেচে গা…’। জীবন্ত কিংবদন্তি সংগীতকার ও পপতারকা ফেরদৌস ওয়াহিদের গাওয়া আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় গান এটি। এখনো টগবগে চির তরুণ এই গায়ক তাঁর গাওয়া পুরোনো গান নিয়ে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যান। দূর আকাশে দৃষ্টি মেলে কী যেন খোঁজেন, হঠাৎ সম্বিত ফিরে নড়ে চড়ে বসেন, খুলে বসেন ‘মা মুনিয়া’ গানের অন্তরালের গল্পের ঝাঁপি। এ গানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চিরযুবা গায়ক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ১৯৭৫ সালের শেষদিক কিংবা ১৯৭৬ সালের শুরুর দিকের কথা। এই গানের গীতিকার নূরুল হুদা ছিলেন নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট। পরে অবশ্য তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন। আমার বন্ধু প্রখ্যাত সংগীতকার লাকী আখন্দের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। একদিন লাকী আখন্দ আমাকে বলল, আমার ম্যজিস্ট্রেট বন্ধুটি ভালো গান লিখেন। তোমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেব। পরের সপ্তাহে লাকী তাঁকে নিয়ে আমার ধানমন্ডির বাসায় এলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে দেখলাম অসম্ভব রুচিশীল, অমায়িক, সৃষ্টিশীল এবং ভদ্র একজন মানুষ তিনি। লাকী আমাকে বলল, ওনার লিখা একটি গান তুমি গাইলে ভালো হয়। আমি বললাম ঠিক আছে, বাচ্চাদের ওপর একটি গান করা যেতে পারে যা বড়রাও পছন্দ করবে। নুরুল হুদা সাহেব আর দেরি করলেন না, ওইদিন আমার বাসায় বসেই ৩/৪ ঘণ্টার মধ্যে গানটি লিখে ফেললেন। আমি বললাম এই গানের মধ্যে ‘মা মুনিয়া’ শব্দটি যোগ করলে কেমন হয়। এটি একটি স্প্যানিশ শব্দ। ওই দেশে বাচ্চাদের আদর করে মামুনিয়া ডাকা হয়। আমার কথাটি শুনে লাকী ও নূরুল হুদা সাহেব খুবই খুশি হলেন। গানে মুখরাতেই যোগ করলেন ‘মা মুনিয়া’। লাকী আমাকে বলল, ‘তুই তোর মতো করে করবি’। পরের সপ্তাহে দ্রুত রেকর্ডিং হয়ে গেল। তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। পরে তিনি বিটিভির ডিজি হয়েছিলেন। মুস্তাফিজ সাহেব তখন বিটিভির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘আনন্দমেলায়’ গানটি আমাকে দিয়ে করান। অবাক করার মতো বিষয় প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা-বুড়ো, সবাই সাদরে গানটি লুফে নেয়। চারদিকে মুখে মুখে ফিরতে থাকে ‘মা মুনিয়া মা মুনিয়া…’। আমার ভাবতে অবাক লাগে গানটি প্রচারের প্রায় ৫০ বছর পরেও এটি কীভাবে সমান জনপ্রিয় হয়ে আছে। এর সংগীত পরিচালনা করেছিলেন লাকী আখন্দ এবং এটি রেকর্ড করা হয়েছিল ফার্মগেটে অবস্থিত ঢাকা রেকর্ডিং কোম্পানিতে। এ দেশে বাচ্চাদের গানের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি নতুন ডাউমেনশন। এই গানের প্রথম ভিডিও তৈরি হয় ১৯৮১ সালে। ফেরদৌস ওয়াহিদ গানের গল্প বলতে বলতে গানটি গেয়ে ওঠে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কষ্টের কথা, আজ লাকী আখন্দ আর নুরুল হুদা, দুজনই পৃথিবীতে নেই।’ এ কথা বলার সময় ফেরদৌস ওয়াহিদের চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করছিল। মনে হলো এই অশ্রু তাঁর আনন্দ এবং কষ্ট-দুইয়েরই। এই জীবন্ত কিংবদন্তি জানান, প্রয়াত নূরুল হুদা তাঁর জন্য আরও দুটি গান লিখেছিলেন। এগুলো হলো-‘আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম’, আরেকটি হলো ‘সব আগুন যায় নেভানো’। তিনি বলেন, প্রথম গানটি আজও জনপ্রিয় আর দ্বিতীয় গানটি রুনা লায়লা ম্যাডামের অত্যন্ত প্রিয় একটি গান। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ফেরদৌস তোমার এই গানটি আমার খুব পছন্দের একটি গান।’ এই খ্যাতিমান শিল্পী আরও জানান, ২০১৮ সালে ‘মা মুনিয়া’ গানটিকে হিন্দিতে গেয়ে অ্যালবাম আকারে প্রকাশ করেন তিনি। সাউন্ডটেকের ইউটিউব চ্যানেলে আপ করা হিন্দিতে এই গানের মুখরা হলো ‘প্যায়সা হুজুর’। এর সংগীতায়োজন করেন পার্থ বড়ুয়া। কথা লিখেছেন ভারতের মিয়াজনবি। আবারও চিরচেনা ভঙ্গিতে জনপ্রিয় পপতারকা ফেরদৌস ওয়াহিদ গেয়ে উঠলেন ‘মা মুনিয়া , মা মুনিয়া…, আমি বিদায় নিয়ে অন্য গন্তব্যের পথে হাঁটতে শুরু করলাম…অনেক দূর যাওয়া পর্যন্তও কানে ভেসে আসছিল ‘ও বিড়ালের ছানা গারে গান গানা…জারি সারি ভাটিয়ালি যা খুশিতে নেচে গা…।
