পোলিও নির্মূলেও কাটেনি শঙ্কা

জয়শ্রী ভাদুড়ী
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আতঙ্কের নাম পোলিওভাইরাস। কারণ পোলিওভাইরাসে আক্রান্ত হলে শিশুটিকে আজীবন পঙ্গু হিসেবে পরিবার এবং দেশের বোঝা হিসেবে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরে পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত না হলেও শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে পোলিওভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া নিয়মিত টিকাদানের বাইরে থেকে যাচ্ছে বিশ্বের কোটি কোটি শিশু। কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হলে আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে এ ভাইরাস। এতে বাংলাদেশের অর্জনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ‘একসঙ্গে, আমরা পোলিও শেষ করব’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পোলিও দিবস। এ বছর দিবসটি সামনে রেখে পোলিও নির্মূলের অগ্রগতির পাশাপাশি টিকাদানের অসমতা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্তকরণ এবং সীমান্ত পেরিয়ে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নতুনভাবে আলোচনায় আসছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পোলিও নির্মূলের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের উচ্চহার বজায় রাখলেই হবে না, প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের টিকাদান পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ শিশু জীবনের প্রথম বছরে কোনো টিকাই পায়নি। ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার কমলেও এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। এসব শিশুর মধ্যে অনেকেই পোলিওসহ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদান থেকে বঞ্চিত : বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় অগ্রগতি থাকলেও সব শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা যায়নি। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও ও গ্যাভির প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, দেশে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি। এ ছাড়া প্রায় ৪ লাখ শিশু প্রয়োজনীয় সব টিকা পায়নি। অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার শিশু সম্পূর্ণ টিকাদানের বাইরে অথবা অসম্পূর্ণ টিকাদানের আওতায় রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে ২০২৩ সালের টিকাদান জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে টিকাদানের ঘাটতি বেশি। শহরাঞ্চলে পূর্ণ টিকাদানের হার ৭৯ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ৮৫ শতাংশ। শহরে ২ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু কোনো টিকা পায়নি, গ্রামে এ হার তুলনামূলক কম। বস্তি, দুর্গম এলাকা এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি বেশি উদ্বেগজনক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের পর দেশে পোলিওভাইরাসের কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। বাংলাদেশ এরপর থেকে পোলিওমুক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশে পোলিও শনাক্তকরণে তীব্র শিথিল পক্ষাঘাত বা অ্যাকিউট ফ্ল্যাসিড প্যারালাইসিস (এএফপি) নজরদারি এবং পরীক্ষাগারভিত্তিক পর্যবেক্ষণ চালু রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চলতি বছরের ৪ অক্টোবর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকা প্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগের কথা জানায়। ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ পর্যালোচনায় দেশের আট বিভাগে টিকাদানের সাফল্য ও ঘাটতি পর্যালোচনা করা হয়। ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব টিকাদানব্যবস্থায় বিদ্যমান রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি সামনে এনেছে বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কভিড-১৯ এর সময় থেকে শিশুদের টিকাদানে একটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কভিডের কারণে টিকাদান বাধাগ্রস্ত হয়েছে, অনেকে কভিডের টিকা নিয়ে পার্শ¦প্রতিক্রিয়ার কথা বলেছেন। এ ছাড়া টিকাবিরোধী একটা গ্রুপও বিভিন্ন অপপ্রচার, গুজব ছড়াচ্ছে। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ সালেও টিকার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মাশুলে দেখা দিয়েছে হামের প্রকোপ। তাই পোলিও বা অন্য কোনো নির্মূল হওয়া রোগ যেন আর ফিরে না আসে এজন্য টিকাদান অব্যাহত রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় ইপিআই ও অন্য প্রতিষ্ঠান মিলে পোলিও রোগী শনাক্তে সার্ভেইলন্স অব্যাহত আছে। উপসর্গ দেখে রোগী শনাক্তের পাশাপাশি বর্জ্য ও ব্যবহৃত পানি পরীক্ষা করেও পোলিও জীবাণু মিলছে কি না তা দেখা হয়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। দেশ থেকে ডিপথেরিয়া নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডিপথেরিয়া শনাক্ত হওয়ায় পর দেশের ভিতরেও রোগী খুঁজে পাওয়া গেছে। তাই পোলিও বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।’

পোলিওমাইলিটিজ এক ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। এটি পোলিও নামেই পরিচিত। একসময় পুরো বিশ্বে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করেছিল এ ভাইরাস। যে কারণে বিকলাঙ্গ বা পঙ্গুত্ববরণ করে মারা গেছে বহু মানুষ। বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০০৬ সালে ১৮ জন পোলিও রোগী শনাক্ত হয়। এরপর থেকে দেশে এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া না গেলেও বিশেষজ্ঞরা শঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) তথ্য বলছে, ১৯৮৮ সালে সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার। ২০০৫ সালে ছিল ২ হাজার। ২০১৪ সালে ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ১১টি দেশকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করে সংস্থাটি।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকে। অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে গুরুতর হলো-জ্বর, শ্বাসকষ্ট শেষে পক্ষাঘাত বা পঙ্গুত্ববরণ। আক্রান্তের হার বেশি হলে নানা জটিলতাসহ মৃত্যু হয় এ রোগীর। এ ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকলে পরবর্তী কয়েক মাস তার মলমূত্রের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। সে কারণে পোলিও আক্রান্ত কোনো মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে গেলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এ রোগ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে নবজাতক শিশুদের পোলিওর মুখে খাওয়ার টিকা ও ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হয়ে থাকে। সারা দেশে পোলিও নির্মূল ও ভবিষ্যতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব যাতে না ঘটে এ লক্ষ্যে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights